বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:৫৬ পূর্বাহ্ন

আমাদের দেশে সমাজতন্ত্রের বর্তমান হালচাল

জহিরুল ইসলাম (শাহিন) / ২৮১
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২২

“মেহনতী জনতার সাথে একাত্ম হও, শ্রমজীবি জনতার সাথে জোট বাধো, কৃষক শ্রমিকের নায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত করো, সবার অধিকার সমান, সর্ব হারার মতবাদ, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, সা¤্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমরা উদ্ধত উচ্চারন, শিক্ষায় চেতনা, চেতনায় বিপ্লব, বিপ্লবে মুক্তি, সেকুলার বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েম করো, করতে হবে। ধর্ম নিরপেক্ষ হতে হবে। অর্থাৎ মুসলমানেরা মুসলমানদের ধর্ম পালন করবে, হিন্দুরা হিন্দু ধর্ম, খৃষ্টানেরা খৃষ্টানদের ধর্ম পালন করবে। কত সুন্দর উক্তি, কত সুন্দর বচন, কত সুন্দর কথা। অধিকার সবার, এ অধিকার তোমার আমার। কোন কিছুতে বৈষম্য থাকবে না। সব জায়গাতেই,সবকিছুতেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে, রক্তে আনোলাল, রাত্রির বৃন্ত থেকে ছিড়ে আনো ফুটন্ত সকাল,” এই উক্তিগুলি সমাজতান্ত্রিক দলে অত্যন্ত গঠনমুলক কথা যাহা দেশ ও দশের মানুষের নিরাপদে বসবাস করা এবং সব ধরনের অধিকার সমানভাবে ভোগ করা। শ্লোগান গুলির মর্মকথা আছে, যথার্থতা আছে, আছে সারবস্তু। উক্ত শ্লোগান গুলির সংগে জড়িত সকল শ্রেণীর সমাজতন্ত্রমনা দলগুলোর। উক্ত শ্লোগান গুলির অর্থই হচ্ছে গরীবের ভাগ্য পরিবর্তন কথা, গরীব, দু:খী, দুস্থ, আতুর ভূমিহীন জনগনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা, যে কৃষক রোদ্রে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সোনার ফসল ঘরে তোলে, সকল শ্রেনীর মানুষের আহার যোগায়, তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা, তাদের নায্য অধিকার ও দাবি প্রতিষ্ঠিত করা, যে গরীব মেধাবী ছাত্র ছাত্রী অর্থের অভাবে দুমুঠো আহার জুটাতে পারেনা। শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করতে পারে না, উচ্চ শিক্ষা লাভ করার মত যোগ্যতা থাকা সত্বেও জায়গা পর্যন্ত পৌছাতে পারছে না, তাদের পাশে দাড়িয়ে তাদের যোগ্যতার জায়গায় পৌছে দেওয়া, পুজিবাদীরা অধিক মুনাফার আশায় অতিরিক্ত পুজি বিনিয়োগের মাধ্যমে মেহনতী, খেটে খাওয়া শ্রমিকদের সহিত প্রতারনা করা, তাদের শ্রমের নায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে রাখা তাদের পক্ষে কথা বলা, অন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, দুর্নীতি মুক্ত, শোষন মুক্ত, সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা, নারী শিক্ষাকে আরও তরান্বিত করা, নারী ও পুরেষদের মধ্যে সম অধিকার বন্টন করা, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যারা রাজনীতি করেন তারাই তো সমাজ তান্ত্রিক। সমাজের মানুষের কথা তো তারাই বলেন। সমাজ পরিবর্তনের কথা তো তারাই বলেন। জীর্ন সমাজ ভেঙ্গে নতুন সমাজ গড়তে হবে। এটাতো তাদেরই গঠন তন্ত্র। তবে কেন আমাদের দেশের স্বাধীনতার পক্ষে যারা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা, দেশের জনগনের কথা বলে যারা, সার্বহারার পক্ষে যারা, কৃষকের পক্ষে যারা তারাই তো আজ জাতির নেতৃত্ব দিবে। জাতি তো তাদের দিকেই তাকিয়ে থাকবে। কিন্তু বিধি বাম, হয়তো বা সামন্ত বাদ, সাম্যবাদ বা সমাজ তন্ত্রে বিশ্বাসী নেতা কর্মীদের নেতৃত্বে কোথাও ঘাটতি আছে অথবা সমাজ পরিবর্তনের যে সংবিধান কার্লমার্ক্স, লেনিন এবং ষ্ট্যালিন এবং অন্য সমাজতন্ত্রপন্থি নেতারা এবং শাসকরা যা বলে গেছেন যেখানে কোন সমস্যা আছে কিনা অথবা নেতারা দিকভ্রম হয়ে অধিক পুজি বা মুনাফা অর্জনের জন্য পুজিবাদীদের সাথে হাত মিলিয়েছেন কিনা অথবা সমাজ তন্ত্রের দোহাই দিয়ে বা সমাজ তন্ত্রের নাম ব্যবহার করে বুর্জোয়া ফ্যাসীবাদী চরিত্র ধারন করে নিজেদের আদর্শিক রাজনীতির কবর দিয়ে ভয়ংকর রুপ ধারন করেছে কিনা এটাই আজকের ভাবার বিষয়। মুখে সমাজতন্ত্রের কথা বলবো, আবার দামী দামী গাড়ী বাড়ী, কল কারখানার মালিক হবো, অসহায় দরিদ্র শ্রমিক শ্রেণীর মানুষের রুটি রুজি হনন করবো তা তো হতে পারে না। এটা কখনও সম্ভব হয় না। আমার মতে বা আদর্শে এবং বুর্জোয়া রাজনীতির সংগে যারা জড়িত তাদের কে চিহিুত করার সময় এখনই। সমাজতন্ত্রের নাম ভাঙ্গিয়ে সমাজতন্ত্রের কথা বলে রাতারাতি এত পরিবর্তন কিভাবে আসে? এখন বিভিন্ন সমাজ তান্ত্রিক দলে বিশ্বাসী নেতাদের এই মুহুর্তে ভাবা উচিত এটা যদি চলতে থাকে আমার মনে হয় বেশী দিন সময় নিবে না দু চার বছরের ভিতরেই দেশ থেকে সমাজতন্ত্র নামক আদর্শটি আর থাকবে না। চিরতরে উঠে যাবে। নি:সন্দেহে বলা যায় এ কথা। সত্তর বা আশির দশকের দিকে আমরা যখন অনেক ছোট ছিলাম তখন আমরা গ্রামে গঞ্চে জাতীয় সমাজ তান্ত্রিক দল, ইউনাইটেড কমিউনিষ্ট লীগ, সাম্য বাদী দল, বাংলাদেশের কমিউটিষ্ট পার্টি, গণতান্ত্রীক দল, সাম্যবাদী দল, সর্বহারা মানুষের দল এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল, ইত্যাদি দলের অনেক নেতা কর্মী গ্রামে গঞ্চে, দেখেছি, সেগুলি এখন বিলুপ্তির পথে। সাতক্ষীরা সরকারী কলেজ, কলারোয়া সরকারী কলেজ, যশোর এম, এম, কলেজ সরকারী বি, এল বিশ্ব বিদ্যালয় কলেজ, বাগের হাট পি, সি, কলেজ, কুষ্টিয়া, সরকারী কলেজ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর রাজবাড়ী, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর রংপুর সহ এমনকি টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত বাম সংগঠন গুলোর তৎপরতা এবং বিশেষ করে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন গুলোর কার্যকরী ভূমিকা সকল শ্রেণীর জনগনের ভিতর এবং বিভিন্ন ছাত্র ছাত্রীদের ভিতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতো। এবং সাধারণ ছাত্র ছাত্রীরা ও উক্ত বামমনা ছাত্র সংগঠন গুলোর কর্মকান্ডে সহযোগিতা ও অনেকটা সমর্থন দিত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এ কি হাল হয়েছে মনে হয় এখনকার সময়ে প্রতিষ্ঠান গুলি বা বিশ্ববিদ্যালয় গুলির ছাত্র ছাত্রীরা অনেকটা ভূলে গেছে যে বাম রাজনীতি কি? হয়তো এমন ও হচ্ছে বাম রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতাদের নাম ও আমার মনে হয় সাধারন জনগন ও ছাত্রছাত্রীরা ভূলে গেছে এত বিস্তর পার্থক্য কেন? তখন কার নেতাদের ভেতরে দেশত্ববোধ ছিল, দেশের প্রতি আন্তরিক ছিল, প্রতিবাদী কষ্ঠস্বর ছিল, আদর্শিক গুনাগুন ছিল, অন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে তারা অকুতোভয় সাহসী সৈনিকের মত অগ্রনী ভূমিকা পালন করতো, ঘুষ দুনীর্তর বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতো। গরীব অসহায় ভূমিহীন কৃষক বা শ্রমিকদের পাশে দাড়াতো। এখন উল্টোটা হচ্ছে। হয়তো আমরা বাম রাজনীতি করি কিন্তু সমাজতন্ত্রের, সামান্তবাদের, সাম্যবাদের এবং সমাজতান্ত্রিক গনতন্ত্রের সংগা, আদর্শ ও মত একে বারে ভূলে গেছি। আমরা আসলে জানিনা সমাজন্ত্র কি? জানলে জনগন সমাজতন্ত্রের পক্ষেই থাকতো। সমাজতন্ত্র গ্রামে গঞ্জের খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য, অভাবী দু:খ কষ্টে জীবন ধারন করা ছাত্র ছাত্রী দের জন্য, অসহায় শ্রমিক কৃষক শোষিত এবং অত্যাচারিত দের জন্য। নেতারা কি আসলে গ্রামের মানুষের কাছে যায়? তাদের সাথে কোন সম্পর্ক কি আসলে আছে? আমার ধারনা নাই। সুতরাং নাম মাত্র সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়ে বড় বড় শহরে বড় বড় জেলায় বা বিদেশে থেকে আপা মোর জন সাধারনের দল সমাজতন্ত্র কায়েম করা সম্ভব নহে। মুখে বড় বড় বুলি দিয়ে লম্বা লম্বা বক্তব্য দিয়ে আমরা আছি কৃষক সাথে, আছি শ্রমিক দের সাথে, যুদ্ধ করছি স¤্রারজ্য ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, দুর্নীতি মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করছি অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করছি। এসব বলে কোন লাভ হবে না। কোন কাজ হবেনা। আপনারা দামী দামী চার চাকার গাড়ীতে থাকবেন, বিশাল বিশাল ফ্ল্যাটের মালিক হবেন এটা হতে পারে না। প্রকৃত অর্থে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হলে আগে আপনার আমার পরিবর্তনের দরকার। মন থেকে সকল ধরনের লোভ লালসা হিংসা ভূলে যেয়ে, সত্যিকারের দেশ প্রেমিক হতে হবে। দেশকে ভাল বাসতে হবে, জনগনের কাছে যেতে হবে এবং বিশেষ করে মেহনতী জনতার সংস্পর্শে যেয়ে সমাজতন্ত্রের আদর্শিক চিন্তা চেতনা ভাবনা গুলি তাদের সাথে ভাগাভাগি করতে হবে, তাদের সুখ দুঃখের কথা শুনতে হবে। তাদের হ্রদয়ের সাথে আপনাকে মিশে যেতে হবে তাদের বাচার জন্য, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, তাদের প্রত্যেকটা কর্মকান্ডে যোগ দিতে হবে। যেখানে বৈষম্য সেখানেই প্রতিবাদ জানাতে হবে। তখনি আপনার আদর্শিক গুনাগুন, আপনার যোগ্যতা আপনার নেতৃত্ব দেবার মত মনোবল সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌছে যাবে। সত্তর আশির দশকের কমরেডদের এবং মহান নেতাদের আদর্শ ধারন করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তখনই হয়তো বা আবার নতুন করে গ্রামে গঞ্জের মানুষের ভিতরে আস্থা ফিরে আসতে পারে। আরও একটি কথা মনে রাখা উচিত যারা বাম রাজনীতি করে তাদের প্রতি গ্রামের মানুষের শিক্ষিত বা অশিক্ষিত যাই হোক একটা ধারনা আছে যে কমিউনিষ্ট পার্টি যারাই করে তারা নাস্তিক। এই ভ্র্রান্ত মূলক ধারনা টি পালটে ফেলতে হবে। আমার দৃষ্টিতে নাস্তিকতা বলে বাম রাজনীতি তে কিছুই নাই, আছে যার ধর্ম সেই পালন করবে। একথা টি তেমনটা বুঝানো হয় না ফলে বাম রাজনীতির এটাও একটা নেতিবাচক প্রভাব। যাই হোক যারা বাম রাজনীতি তে বিশ্বাসী তারা আবার নতুন করে রাজনীতির পতাকা তলে সমবেত হয়ে, সমগ্র দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পৌছে দিতে পারলে বাম রাজনীতির সুদিন আবার ফিরে আসবে। সাধারণ মানুষ তার সুফল ভোগ করতে পারবে। কারন এই রাজনীতি তে কোন প্রকার বৈষম্য নেই। অধিকার সবার জন্য সমান। শ্রম কখনও বৃথা যায় না। সফলতা আসবেই আমাদের সকলের জানা উচিত উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য চেষ্টার নামই স^াধনা।

লেখকঃ জহিরুল ইসলাম (শাহিন)
সহকারি অধ্যাপক (ইংরেজি)
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ