সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০৫:৪৩ পূর্বাহ্ন

অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের এগিয়ে আসতে হবে

জহিরুল ইসলাম শাহিন / ২০৬
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সারা দুনিয়ার যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যানকর অর্ধেক তার করিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইসলামের এই অমর বানী সারা বিশ্বে অর্থনৈতির উন্নয়নে নারীদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে নতুন অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করবে এবং নারীদের প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালবাসা মর্যাদা তাদের যোগ্যতা দক্ষতা এবং প্রতিযোগীতায় অংশ গ্রহণ এবং সফলতা অর্জন বিভিন্ন কর্মকান্ডে বহুগুন বেড়ে যাবে এবং সরকার ও নারীর পরিবার থেকে সহযোগিতা করলে পুরুষদের পাশাপাশি নারীর ভূমিকায় যে কোন পরিবার বা সামাজিক অবকাঠামোর বা রাষ্ট্রের উন্নয়নে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হবে। সুতরাং নারীদের আর ঘরে আবদ্ধ না রেখে বেকার বসিয়ে না রেখে বাড়ীর ভিতর ও বাহিরের বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশ গ্রহণ করার মত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে তারা আর সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে না বা কারোর কাছে ঘৃণার পাত্র হবে না, তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করার কারণে তাদের আত্মমর্যাদা যেমন বৃদ্ধি পাবে ঠিক তেমনি আমাদের দেশ স্বয়ং সম্পূর্ণ দেশে পরিনত হবে এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে বা সূচনালগে নারী ও পুরুষ এক সংগে বসবাস শুরু করেছে। আজও তা অক্ষুন্ন রয়েছে। সভ্যতা বিকাশে নারী পুরুষ একে অপরের সহযোগী, সহকর্মী হয়ে অনেক ভূমিকা রেখেছে। নব নব আবিষ্কারের মাধ্যমে শোষন বঞ্চনায় বিদ্রোহ করে তারা আজ সারা বিশ্বে সভ্যতার আলো জ্বালিয়েছে একরে পর এক। পৃথিবীর প্রায় ৭৫০ (সাতশত পঞ্চাশ) কোটি মানুষের মধ্যে অর্ধেক নারী। সুতরাং তাদেরকে অবজ্ঞা করার কোন সুযোগ নেই। তাই একথা নিশ্চিন্তে বলা যায়, পৃথিবীর রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতির উন্নয়নে নরের চেয়ে নারীর ভূমিকা কোন অংশে কম নয়। মূলত নারী ও নরের সম্মিলনেই সমাজ, পরিবার তথা সমগ্র দেশের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। মানব সভ্যতার আজকের যে চুড়ান্ত বিকাশ সাধন তার পেছনে শত শত বছরের মানব জাতির কঠোর শ্রম ও সাধনা রয়েছে। কৃষি কাজের সভ্যতার প্রথম বীজ বপন করেছিল নারী। নর নিয়েছে সহযোগী ভূমিকা মাত্র । সমাজ ও সভ্যতার বিকাশে নারী আরো সক্রিয় হয়েছে যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে। মানব কল্যানের মূর্ত প্রতীক হয়েছে আজকের নারী সমাজ, আমরা যদি উন্নত দেশ গুলির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পারবো যে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার, বৃটেন, সুইজারল্যন্ড, ডেনমার্ক জার্মানী, অষ্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি নারীদেরকে উচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। শুধু উচ্চ মর্যাদাই নয় দেশ গড়ার লক্ষ্যে নারীরা পুরুষের সাথে সমান তালে কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলেছে। উন্নত দেশ গুলোতে নারী ও নরের মধ্যে তেমন কোন ভেদাভেদ খুজে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ জাতি ও দেশ গঠনের এমন কোন জায়গা নেই তাদের সোনার কাঠির পরশ লাগেনি। ঠিক তেমনি উন্নত দেশ গুলির ন্যায় আমাদের দেশ বাংলাদেশেও নারী সমাজকে জাতি গঠনে কাজে লাগাতে হবে। সমাজের যা কিছু মঙ্গল তা যদি করতে হয় তাহলে নারীকে সংগে নিয়ে করতে হবে, নারীকে বাদ দিয়ে নয়। তাদরে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ দিতে হবে। নারীরা যদি দেশের মঙ্গলে অংশ গ্রহন না করে তাহলে সে কাজ কখনও সফল হবে না, হতে পারে না। অর্থাৎ নারী সমাজকে শাক্তিতে পরিনত করতে হবে। যে কোন দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে নারী ভূমিকার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায়, এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর যথেষ্ট অবদান রয়েছে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান শাখা হচ্ছে কৃষি, শিল্প, বানিজ্য ইত্যাদি। এই সব শাখার প্রতিটিতেই নারীরা অগ্রনী ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশ কৃষি প্রধান দেশ, বস্তুত কৃষির উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতি। সভ্যতার সুচনায়ই দেখা যায়, কৃষির প্রথম গোড়াপত্তন করেছিল আজরে নারীরা। বীজ বুনে যে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব তা নারীরাই প্রথম আবিষ্কার করে। পুরুষরা নিয়েছিল সহায়ক শক্তির ভূমিকা। স্বামী, সন্তানের কৃষি কাজে সমান তালে সাহায্য করে যাচ্ছে কৃষিবধূ। তাছাড়া বাড়ীর আশে পাশের পতিত জমিতে শাক সবজি আবাদ করে পরিবারের আর্থিক ব্যয় ভার কমানোর ক্ষেত্রে কৃষক বধূ গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখছে। শিল্পখাতের মধ্যে পোশাক শিল্প অন্যতম প্রধান খাত। এই পোশাক শিল্পে বর্তমানে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানী করে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হয়। পোশাক খাত অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় খাত গুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান খাত। এই খাতকে সমৃদ্ধশালী করার জন্য পুরুষের পাশাপাশি নারীরা হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, পোশাকখাত বা গার্মেন্টস খাতের মূল চালিকা শক্তি এই নারী সমাজ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। আমাদের দেশে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প রয়েছে যেগুলো আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। আর এসব ক্ষুদ্র শিল্প ও কুটির শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে আমাদের দেশের নারী সমাজ। দেশের সর্বত্রই গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে আছে এসব ছোট শিল্প। এসব শিল্পের ও প্রধান চালিকা শক্তি নারী সমাজ। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মধ্যে তাঁত শিল্প বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প। তাঁতে বুনানো বাংলার মুসলিন একদিন জগতখ্যাত ছিল। আর তাঁত শিল্পে নারীরাই প্রকৃত অর্থে ভূমিকা রাখে। নারীরা ঘরে বসে তৈরি করে বাঁকা বেতের বিভিন্ন আসবাব, খেলনা মাটির তৈরি হাড়ি, মালসা, শানুক, কলস এবং বিভিন্ন ধরনের খেলনা যা ছোট ছোট শিশুদের কে আনন্দ ও উল্লাসে মাতিয়ে তোলে। কিন্তু বড় পরিতাপের বিষয় আজ এই গ্রামীন ক্ষুদ্র শিল্প ও কুটির শিল্প প্রায় ধ্বংসের পথে। ফলে গ্রামের অনেক নারীরা এখন বেকার হয়ে পড়েছে এবং জাতীয় অর্থনৈতিতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারছেনা। তাই আবার নতুন করে ভাবতে হবে কিভাবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে বাচিয়ে রাখা যায় এবং নারীদের বেকারত্ব ঘুচানো যায়। বাংলাদেশের আরও একটি গুরুত্বপূর্ন শিল্প চা যেখানে হাজার হাজার নারী শ্রমিক নিয়োজিত। চা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হয় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অধিক চাঙ্গা রাখা হয় সেখানে ও নারীরা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছে। এছাড়াও অন্যান্য শিল্প কারখানায় ও নারী শ্রমিকরা শ্রমদান করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সেদেশের প্রতিটি নাগরিককে ভূমিকা রাখতে হয়। সবাই মিলে এক সংগে ভূমিকা নিলে উন্নয়ন কে তরান্বিত করা সম্ভব। যেহেতু দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী ফলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারী ও পুরুষ সমান তালে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাবে এ কথা ভূলে গেলে চলবে না। নারী ও পুরুষের যৌথ কর্ম প্রচেষ্টায় দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হবে কিন্তু সব কিছু আরও সহজতর হবে যদি পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটু বেশী জোর দেওয়া যায়।

লেখক: জহিরুল ইসলাম শাহিন
সহকারী অধ্যাপক
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ