বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০৩:০৮ পূর্বাহ্ন

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা আজ সমাজে অবহেলিত

জহিরুল ইসলাম শাহিন / ২১০
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই, ২০২১

পিতা মাতা আমাদের লালন পালন কর্তা। আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা ভাজন, প্রিয়জন এবং গুনীজন। অন্যদিকে সমাজ গড়ার বা দেশ গড়ার কারিগর হচ্ছেন শিক্ষকরা। সেই জন্যে পিতা মাতা যেমন আমাদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র তেমনি শিক্ষকগণ আমদের কাছে অত্যন্ত সম্মানীয়। শিক্ষকরা আমাদের জ্ঞান দান করেন। আমাদেরকে মানুষের মত মানুষ হিসাবে গড়ে তোলেন। শিক্ষকরা আমদের আদর্শ, আমাদের অনুপ্রেরনা যাহা আমাদেরকে প্রবল ভাবে প্রভাবিত করে এবং জাতির দিক নির্দেশনা দান করেন। তারা সমাজের ও জাতির বিবেক এবং পথ প্রদর্শক। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে এই বেসরকারি স্কুল, কলেজের শিক্ষকরা সমাজের কাছে এবং সরকারের কাছে অত্যন্ত অবহেলিত। এদের কোন মূল্য নেই। কেহ সম্মান দিতে চায়না। কারন এদের সরকারি রাজকোষ থেকে পারিশ্রমিক বাবদ যে অর্থ দেওয়া হয় তাহা একজন কৃষক বা রিকসা চালক বা একজন শ্রমিক যাহা আয় করে তার চাইতে ও অনেক কম। এটা অনেক লজ্জার বিষয়। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে সরকারী ও বেসরকারী স্কুল কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে যে বৈষম্য তৈরী করা হয়েছে তাহা খুবই দুঃখ জনক। হয়তবা সামান্য বিভেদ থাকতে পারে কিন্তু পার্থক্যটা এতই বেশী যে বেসরকারি শিক্ষকদের বেতনের কথা যদি তাদের সন্তানরা জানতে চায়, বা সাধারণ মানুষও জানতে চায় বলতে গেলে নিজের কাছে খুবই লজ্জা লাগে অথবা মিথ্যা কথা বলতে হয়। বেসরকারী স্কুল কলেজের শিক্ষকদের কাছে কোন ব্যবসায়ী বা মাছ মাংসের দোকানদার তাদের পন্য অনেক সময় বিক্রয় করতে চায় না কারন তাদের সরকারী অংশের বেতন অনেক কম। বেসকারী স্কুল কলেজের শিক্ষকরাও ঐ একই প্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া করেছে যেখানে সরকারি স্কুল কলেজের শিক্ষকরা লেখা পড়া করেছেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমমানের ফলাফল নিয়ে বের হচ্ছে তবে পার্থক্যটা কোথায়? সরকারী স্কুল কলেজে মেধা থাকা সত্তে¡ও সবাইতো সুযোগ পাবে না কারণ আসন সংখ্য অত্যন্ত সীমিত। সুতরাং অধিকাংশ যোগ্য, মেধাবী শিক্ষকদেরকে বাধ্য হয়ে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে হয়। বেসরকারী শিক্ষকদের জবাব দিহীতাও অনেক বেশী। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কোর্স যখন পড়ানো হয় তখন তাদের ফলাফলের কারনে ছাত্রছাত্রীর ভর্তির সংখ্যা, বোর্ড খরচ, ফরম ফিল আপ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ চাপে থাকতে হয়। অথচ সরকারী স্কুল কলেজের শিক্ষকদের সেক্ষেত্রে কোন জবাব দিহীতা করা লাগে না। সরকারী স্কুল কলেজের একজন শিক্ষক নানান সুবিধা ভোগ করেন। বাড়ী ভাড়া বাবদ কোন কোন ক্ষেত্রে চল্লিশ পারসেন্ট থেকে শুরু করে ষাট পার্সেন্ট পর্যন্ত, বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ বাবদ, ডিপার্টমেন্টাল ভর্তি বাবদ, মেডিক্যাল ভাতা, পি এফ, পূর্ন উৎসব ভাতা সব মিলিয়ে একটি মোটা অংকের বেতন তারা পান। কিন্তু একজন বেসরকারী শিক্ষক এর বেতনের কথা শুনলে খুবই অবাক লাগে। কোন ইনক্রিমেন্ট বা পি এফ বা প্রতিষ্ঠান থেকে আয়করার কোন সুযোগ নেই। মেডিক্যাল ভাতা মাত্র ৫০০ টাকা, বাড়ী ভাড়া মাত্র ১০০০ টাকা এছাড়া আর কোন আয় তার নাই। সুতরাং এই স্বল্প টাকা দিয়ে বাবা, মা, ভাই বোনদের এবং সন্তানদের নিয়ে সংসার ধর্ম চালানো এবজন বেসরকারী শিক্ষক এর পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব নয়। সামনে ঈদুল আযহা, অনেক শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলাম তারা এবার কোরবানী করতে পারছেন না। কারন দ্রব্যমূল্যের অনেক উর্দ্ধগতি মহামারী করোনায় অনেককেই সংক্রমনিত হতে হয়েছে। এছাড়া সন্তানদের পিছনে অনেক ব্যয়। সুতরাং পঁচিশ পারসেন্ট উৎসব ভাতা নিয়ে কোন ভাবেই উৎসব পালন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া অনেক এর ঘর ভাড়া ও দিতে হয়। ধরি একজন সরকারী কলেজের শিক্ষক এর স্কেল ২৯০০০/- টাকা। উনি কিন্তু উৎসব ভাতা পাবেন উনত্রিশ হাজার টাকা। অপর দিকে একজন বেসরকারী কলেজের শিক্ষক এর স্কেল ২২০০০/- টাকা। উনি উৎসব ভাতা পাবেন ৫৫০০/- টাকা, বাড়ী ভাড়া ১০০০ টাকা এবং মেডিক্যাল ভাতা ৫০০/- টাকা। সর্বসাকুল্যে উনি ঈদ উপলক্ষে বেতন পাবেন ২৯০০০/- টাকা অপর দিকে সরকারী কলেজের শিক্ষক পাবেন প্রায় ৮০০০০/- টাকা। পার্থক্যটা কেমন একবার মিলিয়ে দেখেন। করোনা কালীন সময়ে আমরা দেখেছি মাঠে অন্যের শস্য ক্ষেতে অনেক শিক্ষককে কাজ করতে। রিকসা চালাতে বা বাজারে তরকারী বিক্রি করতে। বলুনতো বড় বড় ডিগ্রী নিয়ে স্কুল কলেজে শিক্ষকতা করতে এসে এত সীমিত আয় দিয়ে কোন রকম ভাবে সংসার চালানো যায় কিনা। বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলো মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজী রেকে। শুধু সরকারী চাকরীজীবিদের স্বার্থ উদ্ধার করার জন্য নয়, যেখানে শিক্ষা মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। সরকারী পর্যায়ের কোন অনুষ্ঠান এখনও বেসরকারী স্কুল কলেজের শিক্ষকরা এবং তাদের ছাত্রছাত্রীরা ছাড়া করা সম্ভব হয় না। মা দিবস, বাবা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ১৫ ই আগস্ট, ৭ ই আগস্ট, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবি দিবস, আন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রভৃতি বাধ্যতা মূলক বেসরকারী স্কুল কলেজের শিক্ষকদের উপস্থিত থাকতে হয়, অন্য দিকে সরকারী স্কুল কলেজের শিক্ষকদের এবং ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি অনেক কম। কিন্তু বেসরকারী স্কুল কলেজের কোন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে কোন কারনে তাহা সরকারের কাছে জবাব দিহি করতে হয়। কেন এরূপ বৈষম্য। এই বৈষম্য দূর করতেহবে। সবার অধিকার সমান হতে হবে। সন্তানের চোখে মুখে হাসি ফোঁটানোর জন্য শিক্ষকদের অবশ্যই শতভাগ উৎসব ভাতা বা বৈশাখী ভাতা দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। আমাদের বাংলাদেশে এখনও পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বড় বড় উর্দ্ধতন সরকারী কর্মকর্তারা বেসকারী স্কুল কলেজ থেকে লেখা পড়া করে সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। দেশে এখনও প্রায় ৯৫% স্কুল কলেজ বেসরকারী এবং সব চাইতে ভাল ফলাফল ঐ সমস্ত বেসরকারী স্কুল কলেজ থেকে আসে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে এখন ও পর্যন্ত শিক্ষকদের অত্যন্ত মর্যাদার সাথে মূল্যায়ন করা হয়। তাদেরকে এখনও কোন ভাবে কোন অমর্যাদাকর অবস্থার স্বীকার হতে হয়নি। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষকদের প্রাপ্ত সম্মান দেওয় হয় না। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও শিক্ষকদের সম্মান অত্যন্ত বেশী। তাদের দেশে সরকারী বা বেসরকারী শিক্ষকদের মধ্যে তেমন বৈষম্য নাই । যেটা আমাদের দেশে আছে। বেসরকারী শিক্ষকদের কোন কিছুই সরকার স্বেচ্ছায় দেয় নাই। আন্দোলন বা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আদায় করে নিতে হয়েছে যেটা অত্যন্ত দুঃখ জনক। এদেশের শিক্ষকরা ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৯৫৬ সালে, ১৯৬২ সালের শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবীর সংগে একাতœতা ঘোষনা, ১৯৬৯ এর গন অভ্যুত্থানে, সর্বোপরী ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনে সরীক হয়েছে। অথচ এই শিক্ষক সমাজই আজকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। বঙ্গবন্ধুর ডাকে এবং তার সফল নেতৃত্বে যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছিল এবং বাংলার জনগন পরাধীনতার গøানি থেকে মুক্তি পেয়েছিল, সেই স্বাধীন দেশে কেন শিক্ষকরা অবহেলিত থাকবে। এটাই আজকের বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের প্রশ্ন। পরিশেষে আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার জাতির জনকের কষ্টে অর্জিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায়। এবং শিক্ষকরা আশা করে বসে আছেন বঙ্গবন্ধু যেমন স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের তদানীন্তন সময়ে সমস্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলি সরকারী করন করেছিলেন ঠিক তেমটি মানষ কন্যা, যথার্থ নেতৃত্ব দান কারী বঙ্গবন্ধু কন্যা আমাদের প্রায় প্রিয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা বেসরকারী শিক্ষকদের সার্বিক দিক বিবেচনা করে অচিরেই সকল বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ এবং শিক্ষকরা যাতে স্বাধীন দেশে তাদের অধিকার নিয়ে বেচে থাকতে পারে এবং পূর্ণ মর্যাদা সমাজ থেকে পায় তার ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি শিক্ষকরা যাতে আসন্ন ঈদুল আযহায় শতভাগ উৎসব ভাতা পায় সেই ব্যবস্থায় করবেন। সর্বোপরি প্রধান মন্ত্রীর কাছে শিক্ষকদের এটুকুই আশা কারণ এক মাত্র তিনিই হচ্ছেন শিক্ষক বান্ধব সরকারের নির্বাহী প্রধান, তিনিই যখন তখন শিক্ষকদের সমস্যা গুলি সমাধান করতে পারেন যদি একটু ইতি বাচক সাড়া দেন। আমরা তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

লেখক: সহকারী অধ্যপক
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ