HEADLINE
কালিঞ্চী এ. গফ্ফার মাধ্যঃ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন বন্দে আদালতে মামলা বৈকারীতে ১’শ পিস ইয়াবাসহ চোরাকারবারি গ্রেপ্তার রাত পোঁহালেই দেবহাটা প্রেসক্লাবের নির্বাচন সাতক্ষীরায় ছাত্রলীগ নেতাকে অস্ত্রকান্ডে ফাঁসিয়ে ভারতে পালালেন মূলহোতা নির্বাচন নিয়ে ভাবার কিছু নেই, আমরা গণতান্ত্রিক দল : সাতক্ষীরায় আ.ক.ম মোজাম্মেল হক কুলিয়ায় পানিতে ভাসছে কাফনের কাপড় পরিহিত লাশ সাতক্ষীরায় দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা: তদন্ত পিবিআইতে সাতক্ষীরায় খোলপেটুয়া নদীর বেড়ী বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত কলারোয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ২৫ ইভটিজিং প্রতিরোধে আমাদের করণীয়
রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ০৬:৫৩ অপরাহ্ন

চীনে আমাদের নববর্ষ

অজয় কান্তি মন্ডল / ২৯১
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২২

ফুজিয়ান প্রদেশের ফুজো শহরের একেবারে শেষ প্রান্তের ‘মিনহউ’ কাউন্টিতে আমাদের বসবাস। আমাদের বলতে আমি, আমার স্ত্রী ও আমাদের একমাত্র কন্যা ‘অন্তু’। পরিবার নিয়ে বিদেশে থাকার তিন বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে যাচ্ছি আমরা। আমাদের প্রবাস জীবনের প্রায় সবটাই করোনা মহামারীতে গ্রাস করেছে। কেননা, পরিবার নিয়ে আসার তিন মাসের মাথায় চীনে করোনার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে যেটা এখনো পর্যন্ত চলমান। তাই নিঃসন্দেহে আমাদের প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতাটুকু অন্যদের থেকে একটু ভিন্ন।

পরিবার নিয়ে চীনে আসার কিছুদিনের মধ্যে আমরা নববর্ষ উদযাপনের সুযোগ পাই। তিথি নক্ষত্র ও চন্দ্র মাসের উপর চীনা নববর্ষের দিন ক্ষন নির্ভর করায় সাধারনত তীব্র শীতের সময়ে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের চীনা নববর্ষ উদযাপিত হয়। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে কোন দেশের জাতীয় পর্যায়ে এত আড়ম্বর এবং ধুমধাম হতে পারে সেটা আমরা ২০২০ সালের নববর্ষে স্বচক্ষে অবলোকন করেছিলাম। নতুন পরিবেশে, নতুন উৎসবের রীতি-রেওয়াজ আমাদের মনের ভিতর অনেকটা আবেগাপ্লুত করে তুলেছিল। চারিদিকে এত বেশি আতশ বাজির ফোয়ারা আমরা আগে কখনো দেখিনি। তাছাড়াও কোন উৎসবের আমেজ যে এত বেশিদিন স্থায়ী হতে পারে সেটাও আমরা প্রথমবার বুঝেছিলাম। চীনা নববর্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘নিউ ইয়ার ইভ’-এ নৈশভোজ করায়। যেটাতে আমরা প্রতিবার অংশীদার হই। চীনের প্রধান এই উৎসবকে ঘিরে অনেক প্রস্তুতি বহু পূর্ব হতে লক্ষ্য করা গেলেও এবারের নববর্ষ চীনাদের একটু বেশি জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করতে দেখেছি। এবছর তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে কিনা আমার জানা নেই। তবে চীনাদের বর্ষপঞ্জিতে বছরগুলিকে ক্রমানুসারে যে ১২ টি প্রাণীর নামের উল্লেখ আছে সে অনুযায়ী এবছর ‘বাঘ বছর’। বাঘকে বেশ শক্তিশালী এবং হিংস্র; সে অনুসারে বাঘ্র বছরকে স্বাগত জানানো বেশিই আড়ম্বরপূর্ণ এবং ভিন্ন হবে সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়াও মহামারী করোনা বিগত দুই বছরের চীনাদের নববর্ষের আনন্দকে একেবারে ম্লান করে দিয়েছে। একদিকে বাঘ্র বছর অন্যদিকে বিগত দুই বছরের কিছুটা ম্লান হয়ে পড়া আনন্দের ঘাটতি এবারে পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ মোটেও হাতছাড়া করেনি চীনারা। তাদের এই আনন্দের অংশীদার যাতে আমরাও পুরোপুরিভাবে হতে পারি সেজন্য আমাদের মত প্রবাসীদের কথাও চীনারা মাথায় রাখে। তাইতো নববর্ষের আগের দিন ইন্টারন্যাশনাল কলেজের ডিন মহোদয় সহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের বাসায় এসে বেশ কিছু উপহার সামগ্রী ও শুভেচ্ছা বার্তা সম্বলিত কার্ড দিয়ে গেছে। আমার টিউটরও আমাদের বেশ কিছু উপহার দিয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ফুজিয়ান প্রদেশে বেশ বৃষ্টি হয়। এই বৃষ্টির তীব্রতা মনে হয় নববর্ষের সময়ে বেশ বেড়ে যায়। কেননা, বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের তেমনটাই মনে করিয়ে দেয়। তীব্র শীতের সাথে ঝুম ঝুমিয়ে বৃষ্টির মধ্যে চারিদেকে আতশ বাজির ফোয়ারা ও পটকার শব্দে নিজেদের মনে এক অসাধারণ ভালো লাগা অনুভূতি কাজ করে। নববর্ষে আকাশ জুড়ে হরেক রঙের আতশ বাজির ফোয়ারা এবং আলোর ছটায় ভালো লাগা এক অসম্ভব মুহূর্ত পার হয়। সমস্ত রাস্তাঘাট, বিপনি বিতান, বিনোদন কেন্দ্র ও দর্শনীয় স্থানগুলো বিভিন্ন আলোক সজ্জার সাথে নানা রঙের বৈদ্যুতিক আলোর ছটায় মনে করিয়ে দেয় দেশীয় বিভিন্ন উৎসবের আমেজ।

মনে পড়ে ছোটকালে পহেলা বৈশাখে গ্রামে ঘুরে নগর কীর্তনে সারাটা দিন অতিবাহিত করার মুহূর্তগুলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন। যেখানে খুব ভোরে বেরিয়ে পড়তাম রমনা বটমূলে এবং চারুকলা উদ্যানে। এরপর পহেলা বৈশাখের দুপুরে থাকত আবাসিক হলের বিশেষ খাবার যেটা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করত। সবশেষে যেতাম বিকেলের বৈশাখি মেলায়। যে মেলায় গ্রামীণ ঐতিহ্য বহনকারী হরেক রকমের জিনিস মিলত। কাঠফাটা গরমের ভিতর মেলায় ঘুরে ভিন্ন ভিন্ন জিনিস কেনা হত, একসময়ে ক্লান্ত শরীর সতেজ হত বরফ শীতল লেবুর শরবত বা আইসক্রিমে গলা ভিজানোর পরে। এরকম আরও অনেক নানারকমের স্মৃতি মনের মণিকোঠায় নাড়া দেয়।

জানি কালের পরিক্রমায় বিশ্ব একদিন শান্ত হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সেই দিনের অতি সন্নিকটে আমরা অবস্থান করছি। দেশে ফিরব এবং দেশীয় সবকিছুকে আবার আগের মত খাপ খাইয়ে নিয়ে চলব। ফিরে পাব দেশীয় সকল সংস্কৃতি, সকল আচার অনুষ্ঠান। কিন্তু তবুও কেন জানিনা মন ডুকরে কেঁদে ওঠে। প্রবাস জীবনে দেশীয় সংস্কৃতিসহ আপন জনের সাথে উৎসব উদযাপনের আমেজ মিস করলেও এই ফুজো শহরের অলিগলি, ফুজো শহরের দৈনন্দিন জীবন আমাদের মনের মণিকোঠায় আগামীতে চাপা কষ্ট হয়ে জানান দেবে। যেখানে উৎসব পালনে নেই কোন ভেদাভেদ, মারামারি, হানাহানি। যেখানে উৎসব পালনে নিরাপত্তা বাহিনীর স্বশস্ত্র মহড়ার প্রয়োজন পড়েনা। এজন্য এখনকার প্রতিটি দিনগুলো বেশ মলিনভাবেই বিদায় হয়। মনের অজান্তে ভিতর থেকে দীর্ঘনিঃশ্বাস বের হয়ে আসে। তাইতো, ভিন দেশের ভিন অনুষ্ঠান, যার ভিতরে নিজেদের সংস্কৃতির বেশ অপূর্ণতা থাকলেও মানিয়ে নিই নিজেদের অনুষ্ঠান ভেবে। তারপরেও, শ্রাবণের আঝোর ধারার মত ক্লান্তিহীনভাবে আকাশ ভেঙে ঝরা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকি। যতদূর চোখ যায় সবটাই গগনচুম্বী পাহাড় আর পাহাড়। কখনো ঝিরিঝিরি, কখনো প্রবল বৃষ্টির তীব্রতায় দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। সেইসাথে মনের মণিকোঠায় ঝাপসা হয়ে আসে আমার ছেলেবেলা, আমার স্বদেশ, আমার জন্মভূমি, আমার উৎসব, আমার পহেলা বৈশাখ!

লেখকঃ অজয় কান্তি মন্ডল,
গবেষক, ফুজিয়ান এগ্রিকালচার এন্ড ফরেস্ট্রি ইউনিভার্সিটি,
ফুজো, ফুজিয়ান, চীন।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ