রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ০৫:১২ অপরাহ্ন

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

জহিরুল ইসলাম শাহীন / ৭৭
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৭ মে, ২০২২

১৯৭১ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্থানে সংঘটিত একটি বিপ্লব ও সশস্ত্র সংগ্রাম। পূর্ব পাকিস্থানে বাঙালী জাতীয়তাবাদের উত্থান ও স্বাধীকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এবং বাঙালী গণহত্যার প্রেক্ষিতে এই জনযুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের ফলে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক সামরিক জান্তা সরকার ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের বিরুদ্ধে অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনা করে এবং নিয়মতান্ত্রিক গণহত্যা শুরু করে। এর মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী সাধারন বাঙালী নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং পুলিশ ও ইপিআর কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়। সামরিক জান্তা সরকার ১৯৭০ সালের সাধারন নির্বাচনের ফলাফলকে অস্বীকার করে এবং সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যদের আতœসমর্পনের মাধ্যমে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের আগে পূর্ব ও উত্তর পশ্চিম ভারতের মুসলিম প্রধান অঞ্চল নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রস্তাব আনা হয়। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শাহীদ সোহরাওয়ার্দী যুক্তবঙ্গ গঠনের প্রস্তাব দিলেও ঔপনিবেশিক শাসকেরা তা নাকচ করে দেয়। পূর্ব পাকিস্তান রেনেসা সোসাইটি পূর্ব ভারতে আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রস্তাব দেয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও বহু রাজনৈতিক আলোচনার পর ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে বৃটিশরা ভারতের শাসন ভার ত্যাগ করে এবং হিন্দু ও মুসলমান সংখ্যা গরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসাবে যথাক্রমে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুইটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম হয়। মুসলিম অধ্যুষিত বাংলার পূর্ব অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। ভারত প্রজাতন্ত্র দ্বারা বিভক্ত নবগঠিত পাকিস্তান অধিরাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিম দুইটি অংশের ভৌগলিক দুরত্ব ছিল দুই হাজার মাইলের অধিক। দুই অংশের মানুষের মধ্যে কেবল ধর্মে মিল থাকলে ও জীবন যাত্রা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক অমিল ছিল। পাকিস্তানের পশ্চিম অংশ আনুষ্ঠানিক ভাবে পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব অংশ প্রথম দিকে ‘পূর্ব বাংলা’ ও পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তার হিসাবে অভিহিত হতে থাকে। পাকিস্তানের দুই অংশের জনসংখ্যা প্রায় সমান হওয়া সত্তে¡ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রভূত হতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের মধ্যে তখনকার সময়ে ধারনা জন্মাতে থাকে যে, অর্থনৈতিক ভাবে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং এরকম বিভিন্ন কারনে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে। ভৌগলিক ভাবে, বিচ্ছিন্ন দুইটি অঞ্চলের প্রশাসন নিয়ে ও মতানৈক্য দেখা দেয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও পশ্চিম পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী তা মেনে নেয় নি। এর ফল স্বরুপ পূর্ব পাকিস্তানে সৃষ্টি রাজনৈতিক অসন্তোষ ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ অবদমনে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ শে মার্চ রাতে নৃশংস গণহত্যা শুরু করে, যা অপারেশন সার্চ লাইট নামে পরিচিত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম আক্রমনের পর ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলার উদ্ধত উচ্চারণ সাহসী ও অতি জনপ্রিয় গন মানুষের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। অধিকাংশ বাঙালী স্বাধীনতার ঘোষনাকে সমর্থন করলে ও কিছু ইসলাম পন্থী ব্যক্তিবর্গ ও পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত বিহারিরা এর বিরোধীতা করে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ অবলম্বন করে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়া হিয়া খান সেনাবাহিনীকে দেশের পূর্বাংশে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ পূর্ণ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন, যার ফলে কার্যত গৃহযুদ্ধের সুচনা ঘটে। যুদ্ধের ফলে প্রায় এককোটি মানুষ ভারতের পূর্ব অঞ্চলীয় রাজ্য সমূহে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মুখে ভারত মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় ও এর গঠনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে থাকে। তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে বাঙালিরা ইয়া হিয়া খানের এই ঘোষণার বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ প্রতিবাদ জানায়। ঐতিহাসিকভাবে উর্দু শুধুমাত্র ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর, মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলে প্রচলিত ছিল। অন্যদিকে উপমহাদেশের পূর্ব অংশের মানুষের প্রধান ভাষা ছিল বাংলা। পাকিস্তানের ৫৬% মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। পাকিস্তান সরকারের এই পদক্ষেপ পূর্ব বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি বৈষম্য হিসাবে দেখা হতে থাকে। পূর্ব বাংলার মানুষ উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানাতে থাকে। এর ফলে ১৯৪৮ সালেই বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। চূড়ান্ত পর্যায়ের ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে ফেব্রæয়ারী আন্দোলন তীব্র রুপ লাভ করে। এদিনের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ কয়েকজন সাধারণ মানুষ ও ছাত্র নিহত হয়। তার কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো ও পর্যন্ত জানা যায় নি। তীব্র আন্দোলনের ফলে ১৯৫৬ খ্রিঃ এ সরকার বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশে ২১ শে ফেব্রæয়ারী দিনটি শহীদ দিবস হিসাবে পালিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ই নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা অর্থাৎ ইউনেস্কো ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে ফেব্রæয়ারী শহীদদের স্মরণে দিনটিকে আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পাকিস্তান সৃষ্টির আগে থেকেই পূর্ব বাংলা অর্থনৈতিক ভাবে অনগ্রসর ছিল। পাকিস্তান শাসনামলে এই অনগ্রসরতা আরও বৃদ্ধি পায়। কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছাকৃত রাষ্ট্রীয় বৈষম্যই কেবল মাত্র এর পেছনে দায়ী ছিল না। পশ্চিম অংশে দেশের রাজধানী দেশ ভাগের ফলে সেখানে অভিবাসী ব্যবসায়ীদের সংখ্যাধিক্য প্রভৃতি ও পশ্চিম পাকিস্তানের সরকারের অধিক বরাদ্দকে প্রভাবিত করেছিল। বিনিয়োগের জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ীর অভাব, শ্রমিকদের মধ্যে অস্থিরতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা প্রভৃতি কারনে ও পূর্ব পাকিস্তানে বিদেশী বিনিয়োগ তুলনামূলক কম ছিল। এছাড়া পাকিস্তান রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নগর শিল্পের দিকে কেন্দ্রীভূত ছিল, যা পূর্ব পাকিস্তানের কৃষি নির্ভর অর্থনীতির সাথে সামজ্ঞস্যপূর্ণ ছিল না। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের ৭০% এসেছিল পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি থেকে, তা সত্তে¡ ও পূর্ব পাকিস্তান উক্ত অর্থের মাত্র ২৫% বরাদ্দ পেয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প প্রতিষ্ঠান কমতে থাকে। অথবা পশ্চিমে স্থানান্তরিত হতে থাকে। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ১১টি পোষাক কারখানা ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল মাত্র নয়টি। ১৯৭১ সালে পশ্চিম অংশে পোষাক কারখানার সংখ্যা বেড়ে ১৫০টিতে দাঁড়ায়, যেখানে পূর্ব অংশের কারখানার সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ২৬টিতে। ঐ একই সময়ে প্রায় ২৬ কোটি ডলার মূল্যমানের সম্পদ পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হয়ে যায়। ১৯৫৬ সালে সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় বাঙালী বংশোদ্ভূত অফিসার ছিলেন মাত্র ৫% এর মধ্যে ও কয়েকজন মাত্র কমান্ডে ছিলেন, বাকিরা ছিলেন কারিগরি বা প্রশাসনিক পদে। পশ্চিম পাকিস্তানীরা বাঙালীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক মনে করতো। তারা মনে করতো, পাঞ্জাবী ও পাঠানদের মতো বাঙালীদের লড়াই করার ক্ষমতা নেই। যোদ্ধা জাতি, বা মার্শাল রেস এর জাতিগত যোগ্যতার বিষয়টি বাঙালীরা হাস্যকর ও অপমানজনক বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তদুপরি বিশাল প্রতিরক্ষা ব্যয় সত্তে¡ ও পূর্ব পাকিস্তান ক্রয়চুক্তি, ও সামরিক সহায়তা মূলক চাকরির মতো কোনও সুবিধা পাচ্ছিল না, পূর্ব পাকিস্তানরা তাদের মুসলমান পরিচয়ের চেয়ে বাঙালী জাতিসত্তার পরিচয়কে অধিক গুরুত্ব দিতে থাকে। তারা পাকিস্তানের ধর্মীয় ভাব ধারার বিপরীতে ধর্ম নিরপেক্ষতা গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রভৃতি পাশ্চত্য মূলনীতির সমন্বয়ে একটি সমাজ ব্যবস্থা কামনা করতে থাকে। পাকিস্তানের অভিজাত শাসক শ্রেণীর অধিকাংশ ও উদারপন্থী সমাজব্যবস্থার পক্ষ পাতী ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের জন্ম ও বহুমাত্রিক আঞ্চলিক পরিচয়কে একক জাতীয় পরিচয়ে রুপান্তরের জন্য সাধারন মুসলমান পরিচয়কে তারা প্রধান নিয়ামক বলে মনে করতেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পার্থক্য পাকিস্তানের ধর্মীয় ঐক্যের গুরুত্ব কে ছাপিয়ে যায়। বাঙালীরা তাদের সংস্কৃতি, ভাষা, বর্ণমালা ও শব্দ শম্ভার নিয়ে গর্ববোধ করতো। পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণীর ধারনা ছিল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানীর প্রভাব লক্ষনীয়। এই কারনে তাদের কাছে বাংলাভাষা বা সংস্কৃতির কোন গ্রহণ যোগ্যতা ছিল না, সুতরাং ভাষা আন্দোলন বাঙালীদের মধ্যে পাকিস্তানীদের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতির স্বপক্ষে একটি অবরোধের জন্ম দেয়। ১৯৭১ সালে ধর্ম নিরপেক্ষ নেতারাই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে পরিচালনা করেন। ধর্ম নিরপেক্ষতা বাদীরা বাংলাদেশের বিজয়কে ধর্মকেন্দ্রিক পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে ধর্ম নিরপেক্ষ বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিজয় হিসাবে অভিহিত করেন। একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের জন্ম হয়। যেখানে পাকিস্তান সরকার তখন ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় হিমশিম খাচ্ছিল। স্বাধীনতার পর আওয়ামীলীগ সরকার ধর্ম নিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র অন্যতম মূলনীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে। এবং পাকিস্তান পন্থী ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীরা প্রত্যক্ষ করে যে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিভিন্ন সময়ে খাজা নাজিমউদ্দিন, শহীদ হোসেন সোহারাওয়ার্দী প্রমুখ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে ও পশ্চিম পাকিস্তানী রাষ্ট্র মন্ত্রী তাদের বিভিন্ন অজুহাতে পদচ্যুত করতে থাকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে শাসনের নামে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ই নভেম্বর বিকেলে একটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্নিঝড় পূর্ব পাকিস্তানের ভোলা উপকুলে আঘাত হানে। স্থানীয় বড় বড় নদীর জোয়ার ও ঘূর্নিঝড়ের আঘাত হানার সময় যুগপৎ হওয়ায় প্রায় ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এই ঘূর্নিঝড়কে ইতিহাসের ভয়াবহতম ঘূর্নিঝড় হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। প্রাকৃতিক ব্যাপক বিপর্যয় সত্তে¡ও পশ্চিম পাকিস্তান সরকার সাহায্য করার ক্ষেত্রে গড়িমসি করতে থাকে। এতে খাবার ও পানির অভাবে অনেক মানুষ মারা যায়, সরকারের সাহায্য সহযোগিতা তাৎক্ষনিক না থাকার কারনে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে দেয়। ঘূর্নিঝড় আঘাত হানার দশ দিন পর পূর্ব পাকিস্তানের এগারো নেতার বিবৃতে প্রানহানির জন্য সরকারের প্রতি ‘‘অপরাধমূলক অবহেলা ও বৈষম্য এবং সচেতনভাবে মানুষ মারার’’ অভিযোগ আনা হয়। তারা সংবাদ সম্মেলনে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা প্রচার না করার জন্য ও রাষ্ট্রপতিকে অভিযুক্ত করেন। ২৪শে নভেম্বর মাওলানা ভাসানী প্রায় ৫০,০০০ মানুষ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং রাষ্ট্রপতির অক্ষমতার অভিযোগ তোলেন এবং পদত্যাগেরর দাবি করা হয়। মার্চ মাস থেকে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনায় ত্রাণকাজে জড়িত ঢাকার দুইটি সরকারী প্রতিষ্ঠান দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ ছিল। প্রথমবার হরতাল ডাকায় সাময়িক বন্ধ থাকার পর আওয়ামী লীগের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে ত্রাণকার্য আরও বিলম্বিত হয়। উত্তেজনা বাড়তে থাকায় ঘূর্নিঝড় উপদ্রব স্থান থেকে বিদেশী কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। এই সংঘাত বা ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার দিকে ধাবিত হয়। ১৯৭০ সালের ভোলার ঘূর্নিঝড়কে ‘‘পাকিস্তানের প্রতি বাঙালীদের বিশ্বাসে কফিনে শেষ পেরেক’’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। এবং ইতিহাসে প্রথম বারের মত একটি প্রাকৃতিক দূর্যোগ একটি দেশের গৃহযুদ্ধে কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরপর ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারন নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের বরাদ্দকৃত ১৬৯ টি আসনের মধ্যেই ১৬৭ টি আসন আওয়ামী লীগ পায়। এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তানে কোন আসন না পেয়ে ও আওয়ামী লীগ ৩১৩ টি আসন বিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে কিন্তু সরকার গঠনে পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধীতা করে। জুলফিকার আলী ভূট্টো শেখ মুজিবের ছয় দফা ও প্রত্যাখ্যান করেন। সুতরাং নতুন করে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের মধ্যে। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ শেখ মুজিব ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালী জাতির মুক্তির জন্য, বাঙালীর স্বাধীনতার জন্য, বাঙালীর মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এবং বিশেষ করে সামরিক আইন প্রত্যাহার করার জন্য প্রদান করেন। এবং তার ঐ ঐতিহাসিক ভাষণই মূলত বাঙালীদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। এবং সেই থেকে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বহু বাঙালী মৃত্যুবরণ করেন, কেহ পঙ্গুত্ব বরণ করেন এবং মা বোন তাদের সন্তান হারান। পরিশেষে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে বসবাস করে মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে প্রায় সাত কোটি বাঙালী। এই ভাবে ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত বিভাজনের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরী করে।

লেখক: জহিরুল ইসলাম শাহীন
সহঃ অধ্যাপক
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ