শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:০৯ পূর্বাহ্ন

ছাত্র রাজনীতির একাল-সেকাল

জহিরুল ইসলাম (শাহিন) / ১৭৭
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২২

শুধুু আমাদের দেশেই নয় পৃথিবীর সকল দেশের মানুষ জানে শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি লাভ করতে পারে না। শিক্ষাই জাতিকে কলুষিত থেকে মুক্তি দেয়। শিক্ষা দেশ গঠনে গুরুত্ব পুর্ণ ভুমিকা রাখে। এক কথায় শিক্ষা দেশ ও জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা বান্ধব সংস্কৃতি, সমাজ, পরিবার, গোষ্ঠী, জাতি সবাইকে সকল শ্রেণীর বাধা বিপত্তি থেকে মুক্তি দেয়। তাই সারা বিশ্ব ও বাংলাদেশের ও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সমাজ তপস্যায় মগ্ন থাকে। কিন্ত বর্তমান সময়ের ছাত্র সমাজ রাজনীতির সংগে যুক্ত হয়ে ছাত্র সমাজ কে কলুষিত করছে। তাদের কাছে বর্তমানে শিক্ষার চেয়ে জাতীয় রাজনীতির লেজুড় বৃত্তি করা ও নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করা প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাত্ররা আজ প্রভাবশালী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র ছায়ায় থেকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, চাদাবাজি, টেন্ডার রাজির সংগে জড়িয়ে পড়েছে ফলে গোটা জাতির সামনে এক ঘোর অমানিশা অপেক্ষা করছে। এ জন্য ছাত্র সমাজ শুধু দায়ী নয় এর সংগে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিবেক বর্জিত শিক্ষকরা ও অনেক অংশে দায়ী। এ মুহুর্তে আমরা সিলেটের শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কি এক অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ ছাত্র ছাত্রীরা যেন অসহায় হয়ে পড়েছে। ইচ্ছা থাকলে শিক্ষকরা সবাই মিলে বা সিনিয়র শিক্ষকেরা বা শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে স্থানীয় শিক্ষকরা ছাত্র ছাত্রীদের সংগে বসে তাৎক্ষনিক ভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারতেন। কিন্তু আমরা কি দেখলাম, শিক্ষকদের ভিতরে বিভাজন। প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অতর্কিত ভাবে হামলা চালালো আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর, হামলা না চালিয়ে তারা সাধারান শিক্ষার্থীদের সংগে বসতে পারতেন। এরপর আবার পুলিশী এ্যাকশন এবং আক্রমন আবার গায়েবী মামলা সবই মিলে এক ভীতি কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কেনই বা ছাত্রলীগ আক্রমন করবে। যেখানে শিক্ষকরা জাতির বিবেক, দেশ গড়ার কারিগর তারা কেন সামান্য বিষয় টি নিয়ে মিমাংসার জন্য ভূমিকা রাখলেন না? শিক্ষকরা ছাত্র ছাত্রীদের কাছে পিতৃতুল্য, অভিভাবক এবং প্রকৃত বন্ধু। সেই শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থী দের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তাহলে তো অবস্থাটা এমনই হবে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে টক শোতে দেখলাম কেহ আসল তথ্য উদঘাটন করছে না তাদের বক্তব্যে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন আছে এমন টি মনে করা হচ্ছে। তৃতীয় কোন পক্ষের যদি ইন্ধন থাকে তাহলে পিতৃতুল্য শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কি করেন? সব সময় সাধারন ছাত্ররা মার খাবে, নির্যাতিত হবে, অধিকার ফিরে পাবে না, হলে সিট বরাদ্দ পাওয়া স্বত্তে¡ও সীটে থাকতে পারবে না। এমনটি কেহ আশা করে না। বুয়েট ডুয়েট, রুয়েট, চুয়েট, কুয়েটসহ বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে ছাত্ররা রাজনীতি করে। যারা দেশের সম্পদ, গর্ব, মেধাবী যাদের উপর দেশ চেয়ে আছে যারা দেশকে প্রযুক্তিতে এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে অসম্ভবকে সম্ভব করে পৃথিবীর বুকে আমাদের দেশকে একটা অন্যন্য ব্যতিক্রম ধর্মী রাষ্টে পরিনত করবে, তারা যদি জঘন্যতম সন্ত্রসী কার্য ঘটিয়ে মেধাবী ছাত্রদের জীবন নষ্ট করে দেয় এমন কি নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে তবে সে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারেনা। যদি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রযুক্তি ও মেডিক্যাল কলেজ গুলোতে সাংবিধানিক আইন সমানভাবে প্রয়োগ করা হইতো হয়তো সাধারন শিক্ষার্থীদের উপর এত নীপিড়ন নির্যাতন পরিলক্ষিত হইত না। ছাত্র রাজনিিত তে হয়তো তারা অংশ গ্রহন করতে পারতো না। তারা তাদের পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো কিন্তু পিছনে কারোর না কারোর ইন্ধন আছে। ফলে শিক্ষার্থীরা আজ নিজেদের লেখাপড়ার চেয়ে রাজনীতি নিয়ে বেশি মাথা ঘামাচ্ছে। ফলে তাদের সম্ভাবনা ময় ভবিষ্যত এখন অন্ধকারের দিবে ধাবমান। বিভিন্ন জাতীয় রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংসঠন হিসাবে ছাত্ররা আজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতি কায়েম করছে। চলছে প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া, চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল ও পাল্টা দখলের মহড়া, চাঁদাবাজী টেন্ডারবাজী ও পেশীশক্তি দ্বারা বিশ্ববিদ্যায়ের এবং বিভিন্ন বড় বড় কলেজের হলে সিট দখলের প্রক্রিয়ায় সাধারন ছাত্রছাত্রীরা আজ দিশেহারা। ক্ষমতার ভাগাভাগিতে শিক্ষা জীবন বিপর্র্যস্ত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় গুলো এখন বেশীর ভাগ সময়ে বন্ধ ঘোষনা করা হচ্ছে। রাজনীতির এ মার প্যাচে পড়ে, রাজনৈতিক দলের লেজুড় বুত্তির ফলে, জাতি সর্বনাশের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ছাত্র ছাত্রীরা প্রকৃত শিক্ষা লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন প্রশাসনে বা শিক্ষাক্ষেত্রে বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বা চিকিৎসা ক্ষেত্রে তেমন মেধা বিকাশ হচ্ছে না। এর পিছনে নানা বিধ কারন জড়িত। ছাত্র রাজনীতি বলে কিছু নেই আমাদের দেশে, যা আছে তা হলো কতিপয় জাতীয় নেতাদের পদলোহন আর বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদের চেয়ে বেশীর ভাগ বহিরাগত সন্ত্রাসীরাই নিয়ন্ত্রন করছে। কিভাবে দেশের ও জাতির নেতৃত্বে দিতে হবে, ভুলতে বসছে তাদের কর্তব্যবোধ, ভূলতে বসছে তাদের দ্বায়িত্ব বোধ, ভূলতে বসছে তাদের মূল্য বোধ, ভূলতে বসছে তাদের মেধা বিকাশের ধারা, ভূলতে বসছে তাদের অধ্যাবসায়, ভূলতে বসছে তারা তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরন এবং পারস্পরিক সমঝোতা, এমনটি কেহ আশা করে না। শিক্ষা থেকে তারা আজ অনেক দূরে। তারা আজ শিক্ষার বদলে অন্যায়ের সাথে আপোষ করে শিক্ষার বদলে সমাবেশ, শিক্ষার বদলে মিছিল মিটং, শিক্ষার বদলে সন্ত্রাস এবং বিভিন্ন ধরনের সমাজ বিরোধী কর্মকান্ডের সংগে জড়িয়ে পড়েছে। তাহা ছাড়া ছাত্রদের মধ্যে বিরাজিত হতাশা জাতির অগ্রগতির চাকা কে থামিয়ে দিয়েছে। আমরা যদি ছাত্র রাজনীতির সেকালের দিকে অর্থাৎ একটু নিকট অতীতের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই সফলতার চাবিকাঠি। তখনকার ছাত্র রাজনীতিতে শুধু মাত্র তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা দরকার সকল ছাত্রসংগঠন মিলে একত্রে আলোচনা করে কি ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আন্দোলন করা যায় বা ক্যাম্পাসের পরিবেশ শিক্ষা উপযোগী করা যায়, সেই মতামত ই তারা পোষন করতো। তাদের মধ্যে কোন দ্বন্ধ, সংঘাত, ঝগড়া, মারা মারি কখনও দেখা যায়নি। একজনের বিপদে অন্য সবাই ঝাপিয়ে পড়তেন। তাদের ভিতর কোন টেন্ডার বাজী চাঁদাবাজি বা কোন সন্ত্রাসী মনোভাব দেখা যায় নাই। সর্ব সময় দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের কল্যানের জন্য এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে মাত্র। এটাই ছাত্র রাজনীতির দর্শন হওয়া উচিত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের দিকে তাকালে, ৫৪ র যুক্তফ্রন্টের নির্বাবনের দিকে তাকালে, ৫৬ র দিকে তাকালে, ৬২ র হামিদ খান কতৃক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের দিকে তাকালে, ৬৬ র ছয় দফার দিকে তাকালে, ৬৯ র গন উভূন্থানের দিকে তাকালে, ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকে তাকালে, দেশ স্বাধীন করতে যেয়ে ছাত্র সমাজের ভূমিকার দিকে তাকালে এবং সর্বপরী ৯০ এর শৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাকালে, ছাত্র সমাজ ঐক্য বদ্ধ ভাবে, সাহসী বিরের ন্যায়, ইস্পাত কঠিন দৃঢ প্রত্যয় নিয়ে, বলে বলিয়ান হয়ে কিভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে এক একজন সোনার দেশ বাংলাদেশকে গড়ে দিয়েছে, তাহা আজ আমাদের কাছে চিরস্মরনীয়। অধিকার আদায়ের জন্য তারা এক সংগে একতে হাতে হাত রেখে কাধেঁ কাঁধ রেখে রাজ পথে নেমেছিল। রাজপথ রক্তে রজ্ঞিত করে ছাত্র সমাজ তাদের সকল অধিকার আদায় করেছিল। সেকালের ছাত্রসমাজের এ আত্মত্যাগ কি ভোলার মত? এখন আমরা কি পাচ্ছি? তখন কার দিনের ছাত্র রা বিভিন্ন স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, কোর্ট আদালতে, প্রশাসনে তো চাকরী করছেন। কোন প্রভাব ফেলেন নি। সকল জনগনের ক্ষেত্রে দলগত নির্বিশেষে সেবাদিয়ে গেছেন। বর্তমান সময়ের ছাত্র রাজনীতির এই বিপদজনক ও ভয়াবহ অবস্থা থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য সকল ছাত্রদের কে সচেতন হতে হবে, একে অপরকে ভাল বন্ধু ভাবতে হবে, নিজের ভাই মনে করতে হবে আমরা একই পরিবার থেকে আসছি এমন টি মনে করতে হবে। বিপদে আপদে সকলকে সহযোগিতা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে, ভাষা আন্দোলনে এবং বিশেষ করে ৯০ র স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধে যে ভাবে আন্দোলন সূচনা করেছিল সকল ছাত্র ছাত্রী মিলে এবং মধূর সম্পর্ক একে অপরের ভিতর তৈরী করেছিল। সেই সম্পর্কটা বর্তমান ছাত্র সমাজের ভিতরে থাকতে হবে। কে কোন দল ভাবলে চলবে না। সবাইকে একই সেতুর বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। মনে রাখতে হবে ক্যাম্পাস আমাদের সকলের, আমরা সকলেই এক সংগে একহয়ে একই মতামত নিয়ে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করবো। শিক্ষকদের কাছ থেকে আমরা আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নেব। এর জন্য নিজেদের মধ্যে বা শিক্ষকদের সংগে কোন সম্পর্কের অবনতি বা ঘাটতি হবার কথা নয়। শিক্ষকরাই আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে। এর জন্য নিজেদের মধ্যে আন্তরিকতারা ঘাটতি হবার কথা নয়। শিক্ষকরাই আমাদের চালিকা শক্তি। উনারাই আমাদের অভিভাবক। উভয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে এগিয়ে আসতে হবে দেশ ও জাতির কল্যান সাধনে। কোন অপ্রিতিকর ঘটনা ঘটলে ও তাৎক্ষনিক শিক্ষকদের সংগে বসে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা থাকতে হবে। তখনই আমরা সুষ্ঠভাবে ক্যাম্পাসে অবস্থান করে আমাদের কাংখিত লক্ষ্যে বা গন্তব্যে পৌছাতে পারবো। বর্তমান ছাত্র সমাজকে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। অতীতের ছাত্র সমাজরা যেভাবে রাজনীতি করে গেছেন, বর্তমান ছাত্র সমাজকে সেই ধারাবাহিকতায় চলতে হবে। তাদেরকে অনুসরন করতে হবে। ছাত্র আন্দোলনের অতীত গৌরব বর্তমান ছাত্র সমাজকে ভূলে গেলে চলবে না। তাই তাদেরকে কোন নেতার উপর নির্ভর করা বা কোন গড ফাদারের উপর নির্ভর করলে হবে না। তাদের নিজস্ব গতিতে চলতে হবে। তখনই সম্ভব হবে ক্যাম্পাস থেকে অস্ত্রের ঝনঝনানী, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজী সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বন্ধ হওয়া। দলমত নির্বিশেষে সমলেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। পরিশেষে শিক্ষকদের প্রতি আমাদের অনুরোধ রইল ক্যাম্পাসে সকল শিক্ষার্থীর প্রতি সমান ভাবে আচরন করা, করোর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরন না করা, সকল শিক্ষার্থীই আপনাদের সন্তান। তাদের দেখভালো করা আপনাদেরই দায়িত্ব। সকলের সহযোগিতায় বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে শান্তি পূর্ণ পরিবেশ আবার ফিরে আসুক এবং আমাদের দেশটা আমরা সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তুলি। এই প্রত্যাশায় আমরা আপনাদের কাছে করি।

লেখক: জহিরুল ইসলাম (শাহিন)
সহঃ অধ্যাঃ ইংরেজী
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ