শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:১৯ পূর্বাহ্ন

শিক্ষাগুরু সক্রেটিস এর কিছু কথা

জহিরুল ইসলাম শাহীন / ৩৫০
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১ জুন, ২০২২

ইতিহাসের পাতায় এবং সমগ্র বিশ্বে মহান দার্শনিক হিসাবে যে ব্যক্তিটির নাম সারা বিশ্বের মানুষের মুখে মুখে তিনি আর কেউ নন, পাশ্চত্য সভ্যতার ইতিহাসে বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস। তিনি গ্রীসের এথেন্স নগরীতে ৩৯৯ খ্রিঃ পূর্বে জন্ম গ্রহণ করেন। তার নাম আজ সমগ্র বিশ্বে উজ্জ্বল ও ভাস্কর হয়ে আছে। তিনি এমন এক যুক্তিবিদ এবং নির্ভিক সত্যের প্রতীক এবং মূল্যবোধের ও দার্শনিক আদর্শের প্রবর্তক যা কিনা পাশ্চত্য সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও দর্শনকে দ্ইু হাজার বছরের ও বেশী সময় ধরে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু একটু ভাবলে যে বিষয়টি আমাদের সামনে পরিস্কার তা হলো মহাজ্ঞানী দার্শনিক হিসাবে বিশ্বব্যাপী যার এত সুনাম সেই সক্রেটিসের জীবন ও দর্শন সম্পর্কে বেশী কিছু জানা যায় নি। তবে আধুনিক বিশ্বে সংস্কৃতি ও সভ্যতার যুগে তার জীবন ও দর্শন এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসের উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রথমত তার হাতে গড়া ছাত্র প্লেটোর সংলাপ গুলো, এরিস্টোফেনিসের নাটকগুলো এবং জেনোফেনোর সংলাপগুলো। সক্রেটিস তার জীবনের এই অসামান্য কৃতিত্বের কথাগুলো নিজে কখনো লিপিবদ্ধ করেছেন এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি। মহান দার্শনিক প্লেটোর বর্ণনা মতে দার্শনিক সক্রেটিসের বাবার নাম সফ্রোনিস্কাস, যিনি পেশায় একজন ভাস্কর ছিলেন, আবার অনেকের মতে একজন স্থাপতি এবং তার মায়ের নাম ছিল ফিনারিটি, যিনি পেশায় একজন ধাত্রী, সক্রেটিসের স্ত্রীর নাম জ্যানথিপ। সংসার জীবনে তার ছিল তিন জন পুত্র সন্তান। সংসারে অত্যন্ত অভাব থাকার কারণে সংসার জীবনে তিনি খুব একটা সুখী ছিলেন না। সংসারের জ¦ালা যন্ত্রণা ভূলতে তিনি প্রায় সময় দার্শনিক তত্ত¡ আলোচনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। সত্য, নীতি, যুক্তি এবং আদর্শের প্রতি অবিচল এবং উদ্ধত উচ্চারণ সক্রেটিসকে তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী তথাকথিত অভিযোগে হেমলক বিষ পানে মৃত্যুদÐ দেয় এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আদর্শ ও নীতির প্রতিক বিখ্যাত পন্ডিত দার্শনিক সক্রেটিস নিজ হাতে সেই বিষ পান করে চির নিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়েন। তার নশ্বর দেহটা মাটিতে মিশে গেলে ও তার চিন্তা, চেতনা, ভাবনা, জাগ্রত বোধ শক্তি এবং আদর্শ যুগ যুগ ধরে স্বাধীন ভাবে সারা বিশ্বের মানুষকে চিন্তা করার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। রাস্তাঘাট, মাঠ, হাট-বাজার প্রভৃতি স্থানে যখন যেখানে সুবিধা আবাল বৃদ্ধ বনিতার সাথে বিনা মূল্যে তিনি দর্শন আলোচনায় প্রবৃত্ত হতেন। সোফিস্টদের মত তিনি শিক্ষা দানের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ কে ঘৃণা করতেন। দর্শনের প্রতি তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে এবং মিথ্যাকে মাটি চাপার ক্ষেত্রে বিভিন্ন আলোচনার প্রতি তার ছিল প্রবল মানষিক ঝোঁক ও ইচ্ছা। তিনি প্রায়শই বলতেন, নিজেকে অন্যের ভিতর বিলিয়ে দেয়াই আমার প্রধান অভ্যাস আর এ জন্য এমনিতেই না পেলে টাকা পয়সা দিয়ে হলে ও আমি দার্শনিক আলোচনার সাথী সংগ্রহ করতাম। ‘‘তিনি সোফিস্টদের মত কখনও নিজেকে জ্ঞানী ভাবতেন না বরং তিনি বলতেন আমি তেমন একটা জ্ঞানী নই আমি জ্ঞানানুরাগী মাত্র। একটি জিনিষই আমি জানি, আর সেটি হলো এই যে, আমি কিছুই জানি না।’’ সক্রেটিসের শিক্ষা দান পদ্ধতি ছিল বিশেষ ভাবে উল্লেখ করার মত। তিনি ফরধষববঃরপধষ অর্থাৎ দ্বা›িদ্বক পদ্ধতিতে প্রথমে প্রতিপক্ষের মত স্বীকার করে পরে অত্যন্ত সঠিক ও যৌক্তিক উপায়ে তা খন্ডন করতেন। বিরুদ্ধ পক্ষের জন্য তিনি তর্কের ফাঁদ পাততেন এবং পরাজিত হয়ে যতক্ষণ না প্রতিদ্বন্দী নিজের ভূল স্বীকার করে, ততক্ষণ তাকে প্রশ্ন করতেন। অনবরত প্রশ্ন করে ভূল ধারণা দূর করে তার মুখ থেকেই তিনি সত্য বের করে নিতেন। সক্রেটিস এই জগতের নিগৃঢ় রহস্য নিয়ে আলোচনার চেয়ে জীবন ও সমাজের বাস্তব বিষয়াদি নিয়ে আলোচনায় তিনি ছিলেন বেশী আগ্রহী। যেমন সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে মানুষের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? মানুষের মূল্য কোথায়? মানুষের চরিত্র কোথায়? মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব কিসে নিহিত? এ জাতীয় জীবন ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানই ছিল তার চিন্তার অগ্রাধিকার লঁংঃরপব (ন্যায়) এবং মড়ড়ফহবংং (শুভ) কী, তা জানতে তিনি আগ্রহী ছিলেন। ন্যায় নিষ্ঠ ও শুভ জীবন যাপনের জন্য তার দৃঢ় বিশ্বাস ন্যায় ও শুভ কি, তা জেনে কেউ ন্যায়বান ও কল্যাণ নিষ্ঠ হতে পারে না। তার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান ও প্রজ্ঞাই মানুষের সচারণ ভিত্তি। আর ও এক ধাপ এগিয়ে সক্রেটিস বলেন, আচরণের জন্য জ্ঞান বৃদ্ধি যে অপরিহার্য শুধু তাই নয়, সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি কখনো অন্যায় করতেই পারেন না। ন্যায় ও কল্যাণের ধারণা থাকা সত্তে¡ ও মানুষ কি করে অন্যায় অকল্যাণ প্রবৃত্ত হতে পারে এ ছিল তার চিন্তার বাইরে। সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, নিজ আত্মার যতœ নেওয়া আত্মাকে সৎ ও শুভ লক্ষ্যে পরিচালিত করা মানুষের লক্ষ্য। আত্মা বলতে আমরা যা বুঝি ইউরোপে সর্বপ্রথমে এ ধারণা প্রবর্তন করেছিলেন সক্রেটিস নিজেই, আত্মার অমরত্ব প্রসঙ্গে সক্রেটিসের মত সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও তিনি যে আত্মার অমরত্বে বিশ্বাসী ছিলেন তা তার একটি বিখ্যাত উক্তি থেকে অনুমান করা যায়। অন্যায় অপবাদে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত সক্রেটিস মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে শোকাভিভূত আতœীয় পরিজনদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন, তোমরা দুঃখ করো না । কারণ এই মৃত্যু কেবল আমার দেহ টাকেই বিনাশ করবে, আতœাকে নয়। তিনি বলতেন, শিক্ষাই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, শিক্ষার মধ্যেই মানুষের অন্তরে জ্ঞানের পূর্ণ জ্যোতি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। জ্ঞানের মধ্য দিয়েই মানুষ একমাত্র সত্য জিনিসটা চিনতে পারে। যখন তার কাছে সত্যের স্বরুপ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সে আর কোন অন্যায় বা পাপ কাজ করতে পারে না। মুর্খতা বা অজ্ঞানতা থেকেই সব পাপের জন্ম। তিনি সব সময় চাইতেন মানুষের মনের অজ্ঞানতাকে দুর করে তার মধ্যে বিচার বুদ্ধি বোধকে জাগ্রত করতে। তিনি যুবকদের শিক্ষা দিতেন সুপথে পরিচালিত হওয়ার জন্য। সক্রেটিস তীব্র ভাবে বিশ্বাস করতেন যে পৃথিবী বা গোটা দুনিয়া সম্পর্কে জানার আগে মানুষকে নিজেকে নিজের সম্পর্কে জানতে হবে। এবং এর একমাত্র মাধ্যম হলো যৌক্তিক চিন্তা ভাবনা। তাই তিনি অত্যন্ত জোরের সাথে বলেছেন জগতকে জানতে হলে আগে নিজেকে জানতে হবে, এই প্রেক্ষাপটেই সক্রেটিস বলেছিলেন নিজেকে জান, (শহড়ি ঃযবুংবষভ)। আজকে যদি সক্রেটিসকে বিনা কারণে হেমলক গাছের রস প্রয়োগে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত না করে হত্যা করা না হতো তাহলে জগত হয়তো আরও অনেক মহৎ জ্ঞান পেতে পারত। কিন্তু তার এই অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার নশ্বর দেহের শেষ হলেও চিন্তার শেষ আজও হয়নি। তার অত্যন্ত ¯েœহভাজন প্রিয় শিষ্য প্লেটো ও প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটলের মধ্য দিয়ে সেই চিন্তার এক নতুন জগত সৃষ্টি হলো যা মানুষকে উত্তেজিত করছে আজকের পৃথিবীতে। সুতরাং আমরা সক্রেটিসের জীবন দর্শন থেকে যেটুকু ধারণা পাই সেটা হলো অন্যায় অপরাধ করে, সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্যে রুপান্তরিত করে কিছু দিন জগত সংসারে টিকে থাকা যায়, বেশী দুর যাওয়া যায় না। এথেন্স নগরীতে যে শাসক গোষ্ঠী সক্রেটিসের মত মহান দার্শনিককে সত্যকে আড়াল করতে যেয়ে একান্ত অন্যায় এর ভিতর দিয়ে নির্ভীক সাহসী, ন্যায়ের প্রতীক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে উদ্ধত উচ্চারণ কে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করলো তারা আজ কোথায়? পৃথিবীর সকল দেশের সকল মানুষের হৃদয়ে চির অমর হয়ে আছে। আজ আমাদের শুধুমাত্র সুন্দর সমাজ, সুন্দর পরিবেশ, সুন্দর দেশ পরিচালনা করার জন্য দার্শনিক সক্রেটিস এর কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। উল্লেখ্য যে তাকে পশ্চিমা দর্শনের ভিত্তি স্থাপনকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তিনি এমন এক দার্শনিক চিন্তা ধারার জন্ম দিয়েছেন যা দীর্ঘ ২০০০ বছর ধরে পাশ্চত্য সংস্কৃতি, দর্শন ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে। সক্রেটিস ছিলেন এক মহান সাধারণ শিক্ষক, যিনি কেবল শিষ্য গ্রহনের মাধ্যমে শিক্ষা দানে বিশ্বাসী ছিলেন না। তার কোন নির্দিষ্ট শিক্ষায়ন ছিল না। তিনি মানব চেতনায় আমাদের ইচ্ছাকে নিন্দা করেছেন কিন্তু সৌন্দর্য দ্বারা নিজেও আনন্দিত হয়েছেন।

লেখকঃ জহিরুল ইসলাম শাহীন
সহঃ অধ্যাপক
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ