শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১:১৮ অপরাহ্ন

সাতক্ষীরা জেলা গড়ে উঠার পিছনের ইতিহাস

জহিরুল ইসলাম (শাহিন / ৮৯৮
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২১

বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে অন্যতম জেলা সাতক্ষীরা। বাংলাদেশের দক্ষিন পশ্চিম সিমান্তে অবস্থিত সুন্দরবন সংলগ্ন এবং বঙ্গোপসাগরের সাথে অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে সংযুক্ত। বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে আমাদের এই সাতক্ষীরা জেলা। কিন্তু অতি পরিতাপের বিষয় আমরা হয়তো বা অনেকেই উপলব্দি করতে পারিনা কিভাবে আমাদের জেলা (১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনা প্রধান জনাব হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ এর শাসনামলে) সাতক্ষীরা হিসাবে নামটি এসেছে। আমরা একটু চেষ্টা করে দেখি লেখার মাধ্যমে কিছুটা তথ্য প্রকাশ করা যায় কিনা।
সাতক্ষীরা জেলার আদি নাম-সাতঘরিয়া, আমরা অনেকেই এটা জানি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় বিঞ্চুরাম চক্রবর্তী নদীয়ার রাজা কৃঞ্চচন্দ্রের কর্মচারী হিসাবে ১৭৭২ সালে নিলামে পরগনা কিনে গ্রাম স্থাপন করেন। তাঁর পুত্র প্রাননাথ চক্রবর্তী সাতঘর কুলীন ব্রাক্ষন এই পরগনার প্রতিষ্ঠা করেন এবং নাম দেওয়া হয় সাত ঘরিয়া। তদানীন্তন সময়ে প্রাননাথ সাতঘরিয়া অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন মূলক কাজ করে অনেক পরিচিতি লাভ করেন এবং প্রতাপান্বিত হন। সাতক্ষীরার মহাকুমার প্রকৃত জন্ম হয় ১৮৫২ সালে যশোর জেলার চতুর্থ মহাকুমা হিসাবে এবং কলারোয়াতে এর সদর দপ্তর স্থাপিত হয়। প্রথম মহাকুমা হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নবাব আব্দুল লতিফ। ১৮৬১ সালে মহাকুমা কার্যালয়-সাতঘরিয়া তথা সাতক্ষীরাতে স্থানান্তর করা হয়। ইতি মধ্যেই সাতঘরিয়া ইংরেজ রাজ কর্মচারিদের মুখেই সাতক্ষীরা হয়ে গিয়েছিল। তাই পুরানো সাতঘরিয়াই বর্তমানের আমাদের ঐতিহ্য এবং অহংকার সাতক্ষীরা। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানে এবং মানচিত্রে দক্ষিন পশ্চিম কোনে সাতক্ষীরা জেলার অবস্থান। প্রাচীনকালে এ অঞ্চল খ্যাত ছিল বুড়ন দীপ নামে। এর পাশে চন্দ্র দ্বীপ, মধূদ্বীপ, সূর্যদ্বীপ, সঙ্গাদ্বীপ, জয়দ্বীপ ইত্যাদি দ্বীপ খ্যাত ছোট ছোট ভূখন্ডের অবস্থান পাওয়া যায় প্রাচীন কালের ইতিহাস এবং মানচিত্রে। ঠিক কখন থেকে বা কোন সাল থেকে বুড়ন দ্বীপে মানুষ সমাজবদ্ব ভাবে বাস করতো তার বিস্তারিত ও সঠিক ভাবে তথ্য প্রমানাদি পাওয়া যায়না। তবে রামায়ণ মহাভারতের তথ্যানুযায়ী এ অঞ্চলের সংঘবদ্ব মানুষ্য বসতির গোড়াপত্তন প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছন পূর্বে থেকে। আলেকজান্ডার ভারত আক্রমন করেছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব-৩২৭ সালে। তার ভারত আক্রমনের সময় গঙ্গার মোহনায় গঙ্গারিধি নামের একটি স্বাধীন রাষ্টের উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায়। সাতক্ষীরা জেলাটি ছিল এ রাষ্টের অধীন। আলেকজান্ডারের পর মৌর্য ও গুপ্তযুগে বুড়নদ্বীপ ছিল পুন্ডভূক্তির অন্তর্গত। বুড়নদ্বীপ ঐ সময়ে পরিচিত ছিল খাড়ি অঞ্চল নামে। চন্দ্রবর্ধন খাঁড়ি অঞ্চল দখল কওে নিয়েছিলেন চতুর্থ শতকের দিকে। এর পর বেঠন্যগুপ্ত ৫০৭ সন থেকে ৫২৫ সন পর্যন্ত দক্ষিন পূর্ব বাংলার স্বাধীন নর পতি হিসাবে রাজ্য শাসন করেন। সপ্তম শতকের দিকে শশাংক, ভদ্রবংশ, খরগোরাত ও লোকনাথ বংশ রাজত্ব করেছিলেন এ জনপদে। সপ্তম শতকের গোড়ার দিকে খুব সম্বাবত অত্র সাতক্ষীরা জেলা গৌড়াস্থিপতি শশাংকের কর্তৃত্বধীনে আসে। বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার কওে আছেন শশাংক। তিনিই বাংলার প্রথম শাসনর্কতা যিনি শুধু বাংলাকে নয় বরং বাংলার ভৌগোলিক সীমারেখার বাইরে ও বহুদুর পর্যন্ত তার সর্বভৌমত্ব বিস্তৃত করেছিলেন। রাজা শশাংক নিজে রাজ্যকে শুধু ভৌগোলিক অবস্থানে সুদৃঢ় কওে ক্ষান্ত থাকেননি। তিনি স্বাধীনতা ঘোষনা করে বেশ কয়েক টি রাজ্য দখলে নেন এবং বৃদ্ধি করেন নিজের রাজ্যের সীমানা। পরিপ্রাজক হিউয়েন সাং ৬৩৪ খ্রীষ্টাব্দে যে ভ্রমণ বৃত্তান্ত দিয়েছেন তাতে গঙ্গারিডি রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর সময়ের গঙ্গা রিডি, পুন্ড্রবর্ধন, কর্নসুবর্ন, কজংগল, তা¤্রলিপ্তি, সমতট প্রভৃতি নামে খ্যাত ছিল। বর্তমানের আমাদের এই সাতক্ষীরা জেলা এই সমতটেরই অংশ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী পাল বংশের আমলে দশম শতকের দিকে দক্ষিন পূর্ব বাংলায় স্বাধীন রাজ্য ছিলেন চন্দ্র বংশের রাজ্য ত্রৈলক্যচন্দ্র ও শ্রীচন্দ্র ৯৩০ সন থেকে ৯৫৭ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছেন। চন্দ্র রাজ্যের সময় দক্ষিন বঙ্গ ছিল সমৃদ্ধ জনপদ। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চন্দ্র বংশের নৃপতিরা বেশ কিছুকাল জনপ্রিয় শাসক ছিলেন এ জনপদে শ্রী চন্দ্রের পর কল্যান চন্দ্র (৯৭৫-১০০৩ খৃ:) লহড়চন্দ্র (১০০৩ থেকে ১০২০ খিৃ:) তার পরবর্তী রাজা গোবিন্দ চন্দ্র ( ১০২০-১০৪৫) চন্দ্র বংশের সবচেয়ে প্রতিপত্তিশালী রাজা হিসাবে গোবিন্দ চন্দ্র ইতিহাসে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি চোল রাজ রাজেন্দ্র্র চোলের কাছে পরাজিত হলে- দক্ষিন বাংলার শাসন ভার চলে যায় পাল বংশের হাতে। একাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে পাল রাজারা দাপটের সাথে-দক্ষিন অঞ্চলে নিজেদের শাসন কাজ পরিচালনা করেন। মহীপাল (৯৯৫-১০৪৫) তৃতীয় বিগ্রহ পাল (১০৫৮-১০৭৫) দ্বিতীয় মহীপাল (১০৭৫-১০৮০) রামপাল ( ১০৮২-১১২৪) প্রমুখ। পাল রাজাগন ছিলেন ইতিহাস খ্যাত নৃপতি। ইতিহাস খ্যাত কৈবতর্ক বিদ্রোহ হয়েছিল একাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে। রামপাল এ সময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। বৈর্বত বিদ্রোহের ফলে দক্ষিন পূর্ব অঞ্চলে উত্থান ঘটে বর্মদের। এ বংশের খ্যাত পুরুষ ব্রজবর্ম। পরে তার পুত্র জাতবর্ম-অনেক যুদ্ধে জয়লাভ করে সার্বভৌমত্ব অর্জন করেন। কলচুরি রাজকর্নের একখানি শিলালিপিতে (১০৪৮-১০৪৯) উল্লেখিত আছে জাতবর্ম খুলনা জেলা সহ দক্ষিন পূর্ব বাংলায় চন্দ্র বংশের রাজাকে ধংস করেন। জাতধর্ম কেবল মাত্র নিজের বাহুবলে অঙ্গ কামরুপে ও বরেন্দ্রস্বীয় প্রাধান্য স্থাপন করে খুলনা জেলা সহ দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গে এক স¦াধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এর পর ইতিহাসের অনেক অধ্যায় পার হয়ে গেছে। পরবর্তী সেন আমলের যে শিলা লিপি ও ফলক পাওয়া গেছে তা থেকে জানা যায়-এরা ছিলেন চন্দ্র বংশীয় ও ক্ষত্রিয়। বিজয় সেনের পুত্র বল্লাল সেন (১১৬০-১১৭৮ খিৃ:) সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বাগড়ি নামক এলাকায় প্রশাসনিক বিভাগ সুদৃঢ় করেন। উপবঙ্গ নদী ও জঙ্গলে সমাচ্ছন্ন ছিল। মনে করা হয় বাত্ত ও বাউরি জাতির নামানুসারে ব্যাক্তির নাম হইয়াছে। কলিকাতা অঞ্চল খনন করিয়া দেখা গিয়েছে, সে প্রদেশের বন, বন্য জীবজন্তু সহ বারংবার বসে গিয়েছিল। বঙ্গ ও উপবঙ্গ মেঘনাদ (মেঘনা) ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গার ব-দ্বীপে গঠিত। রাত বরেন্দ্র বঙ্গ মিথিলা পূর্ব হতেই ধন জন পরিপূর্ন ছিল। কিন্তু বাগড়িতে মনুষ্যেও বাসছিলনা। এই স্থান সমুন্দ্র গর্ভথেকে মস্তক উত্তোলন করিতেছিল। আকবর নামায় ইহার ভাটি নাম দেখা যায়। বাগড়ির দৈর্ঘ্য ৫৫০ মাইল ও বিস্তার ৩১২ মাইল। পূর্ব বিক্রমপুর পদ্মার দক্ষিনে ছিল, যখন ধলেশ্বরী দিয়া পদ্মা প্রবাহিত হতো। অতএব এ থেকে বলা যায় বিক্রমপুর পূর্বে বাগড়ির অন্তর্গত ছিল। এখন ইহা বঙ্গের অন্তর্গত হইয়েছে। বাগড়ির এই অংশই প্রাচীন সমতট। পরবর্তীতে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইখিতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি বলতে গেলে কোন রকম বাধা ছাড়াই জয় করেন বাংলা। এ ঘটনার পর লক্ষন সেন প্রায় দুই বছর জীবিত ছিলেন। বখতিয়ার খিলজীর আক্রমনের পর তিনি নদিয়া থেকে পালিয়ে নৌকা যোগে বিক্রমপুরে যান। স্থানঢয় প্রভাবশালী কোমলপাল নামে একজন নৃপতি লক্ষন সেনের রাজত্বকালে খুব সম্ভবত খুলনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল অধিকার করেন। বখতিয়ার খলজীর বঙ্গ বিজয়ের সূত্র ধরেই বাংলার মুসলিম রাজত্বের ভিত্তি স্তাপিত হয়। তবে এ অঞ্চলে মুসলিম শাসন সুদৃঢ় করতে আরো একশত বছরের মত সময় লাগে। বখতিয়ার পরবর্তী শাসক আল মাদান খিলজী (১০১০-১২১২খ্রিঃ) ও গিয়াসউদ্দীন ইওজ খিলজী (১২১২-২৭) দু শাসকই কর গ্রহন করতেন রাজাদের কাছ থেকে। ফলে বলা যায় এ সময় সাতক্ষীরা-খুলনা অঞ্চল পুরোপুরি মুসলমানদের নিয়ন্ত্রনে আসেনি। এর পরে ২৮ বছর (১২২৭-১২৫৫) এ অঞ্চলের ইতিহাস কোলাহল পূর্ণ ছিল। কিছুদিন সমগ্র বাংলা পরিনত হয় একটা প্রদেশে আবার মুগিস উদ্দীন ইওজবেক এর নেতৃত্বে বাংলা ভোগ করে স্বাধীনতা। গিয়াসউদ্দীন বলবনের শাসনামলে সুন্দরবন সহ বেশ কিছু অঞ্চল তার অধিকারে আসে। তিনি প্রথমে দক্ষিন পূর্ব বাংলা আক্রমন করে অধিকার করেন এবং সেনারগাও অঞ্চল আধিপত্য বিস্তার করেন। এ সময়ে চন্দ্রদ্বীপের(বরিশাল) রাজা ছিলেন কায়স্থ-নৃপতি- দশরথ দনুজমর্দন দেব। বুষরা খান (১২৮১-১২৮৭) রুকন উদ্দীন কায়কাউম (১৩০০ খ্রিঃ) এর সময়ে সাতক্ষীরা অঞ্চল তাঁদের অধিকারে ছিল কিনা তার সঠিক প্রমান পাওয়া যায় না। তবে অনেক তথ্য সংগ্রহ করে জানা যায়- পরবর্তীতে সমসুদ্দীন ফিরোজ শাহ সমগ্র দক্ষিণ পূর্ব বাংলা জয় করেন। ফলে বলা যায়- সাতক্ষীরা অঞ্চল তার রাজ্য সীমার অন্তর্ভূক্ত ছিল। ফখরউদ্দীন মোবারক শাহ স্বাধীনতা ঘোষনা করেন-১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১৩৩৯ সনে স্বাধীনতা ঘোষনা করেন শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ। তার সময় থেকে সাতক্ষীরা অঞ্চল চলে যায় শাহী বংশের অধীনে। ১৩৯৯ হইতে ১৪১১ খ্রীঃ পর্যন্ত সাতক্ষীরা অঞ্চল ছিল ইলিয়াস শাহের বংশের অধীনে। ১৪১২Ñ১৪৪২ খ্রীঃ পর্যন্ত বাংলার সিংহাসন অন্তর্দ্বন্দে পূর্ণ ছিল। ১৪৪২ সালে শাহী বংশের নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহ সিংহাসনে বসেন। দক্ষিন বঙ্গের মুকুটহীন স¤্রাট হিসাবে যিনি বিখ্যাত ছিলেন তিনি খান জাহান আলী। এই দরবেশ সেনা দক্ষিণ বঙ্গ জয় করেন ১৪৪২ খ্রীষ্টাব্দে। কথিত আছে যে তিনি বাংলার সুলতান নাসিরউদ্দীন শাহের নিকট থেকে একটি সনদে সুন্দরবন থেকে ভূমি পুনরুদ্ধার করে জনপদ সৃষ্টি করার অধিকার লাভ করেন। নাসির উদ্দীন শাহের পরবর্তী কালে হোসেন শাহী নসরত শাহের সময়ে ও সাতক্ষীরা ছিল তার রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত। ষোড়শ শতকের শেষ দিকে বাংলায় আবির্ভাব হয় বারো ভুঁইয়াদের। কররানী বংশের পতনের পর দক্ষিণ অঞ্চলের ভুইয়া হিসাবে আতœপ্রকাশ ঘটে শ্রী হরি নামের এক ব্রাহ্মনের। তিনি ছিলেন দাউদ কররানীর প্রধান পরামর্শ দাতা। শ্রী হরি সুন্দরবন অভ্যন্তরে মকুন্দপুর স্থানে রাজধানী স্থাপন করেন ও বিক্রমাদিত্য উপাধি ধারন করেন। পরে রাজধানী স্থান্তরিত হয় ধুমঘাটে। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র প্রতাপাদিত্য ছিলেন সমৃদ্ধশালী ও ক্ষমতাধর শাসক। তিনি কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা ও পশ্চিম বঙ্গ নিয়ে একটি স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলেন। বাংলার জমিদারদের মধ্যে প্রতাপাদিত্যই সর্বপ্রথম মুঘলদের আনুকুল্য লাভের জন্য ইসলামখানের নিকট দুত প্রেরণ করেন এবং পরে ব্যক্তিগত ভাবে সুবহুদার এর নিকট আনুগত্য প্রদর্শন করেন। পরে প্রতিশ্রæতি ভাঙার কারনে মুঘল বাহিনীর সাথে দুটো যুদ্ধ হয। প্রথম যুদ্ধ হয় সালকা নামক স্থানে ১৬১১ খ্রীষ্টাব্দে। এ যুদ্ধে প্রতাপের পক্ষে নেতৃত্ব দেন তার জেষ্ট্য পুত্র উদয়াদিত্য ও মোঘল বাহিনীর পক্ষে নেতৃত্ব দেন জামাল খান। দ্বিতীয় যুদ্ধটি হয় কাগারঘাট ও যমুনার সঙ্গমস্থলে। ১৬১২ খ্রীষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে। এ যুদ্ধে তিনি পরাজিত হয়ে আতœ সমর্পণ করেন গিয়াসউদ্দীন খানের নিকট। মোঘল বাহিনীর হাতে বন্দী হওয়ার পর সম্ভবত বন্দী অবস্থায় দিল্লী যাওয়ার পথে বেনারসে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। প্রতাপাদিত্যের পতনের পর খুলনা সাতক্ষীরা অঞ্চল চলে যায় জমিদারদের নিয়ন্ত্রনে। খান-ই আজম, মির্জা আজিজ কোকা (১৮৮২-১৮৮৩) প্রতাপের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পুরস্কার স্বরূপ মোঘলদের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন আমিদপুর, সৈয়দপুর, মুগদাগাছা ও মল্লিকপুর জমিদারী। এ সময়ে দক্ষিন অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অপরাপর জমিদাররা হলেন ভবেশ্বর রায়, মাহতীব রায়(১৫৮৮-১৬১৯) কন্দর্প রায়, মনোহর রায়(১৬৪০-১৬৭৫) ও শ্রী কৃষ্ণ রায় (১৭০৫-১৭৭২)। সুন্দরবন সাতক্ষীরা অঞ্চলে প্রতাপাদিত্যর পর ব্যাপক প্রশাসনিক উন্নতি হয় হেংকেলের আন্তরিকতায়। ১৭৮১ খ্রীষ্টাব্দে টিলম্যান হেংকেল প্রথম ম্যাজিস্ট্রেট ও জজ নিযুক্ত হন যশোর অঞ্চলে। ঐ বছরে প্রথমে যশোরে আদালত স্থাপিত হয়। ১৭৮৬ সালে তিনি খুটি দিয়ে সিমানা চিহ্নিত করেন। ঐ একই সালে যশোর পৃথক জেলার মর্যাদা পায়। এরপর থেকে যশোর অঞ্চল প্রশাসনিকভাবে বিকেন্দ্রীকরণ হতে থাকে। পরবর্তীতে সাতক্ষীরা অঞ্চল মহকুমার মর্যাদা পায় ১৮৫২ খ্রীষ্টাব্দে। মহকুমার মর্যাদা পাওয়ার পর প্রথমে সাতক্ষীরাকে যুক্ত করা হয় নদীয়া জেলার সাথে। ১৮৬১ সালে নদীয়া থেকে সাতক্ষীরাকে বিভক্ত করা হয় ২৪ পরগনার সাথে, খুলনা জেলার মর্যাদা পায় ১৮৮২ সালে। জেলার মর্যাদা পাওয়ার পর লর্ড রিপনের (১৮৮০-১৮৮৪) আন্তরিক প্রচেষ্টায় সাতক্ষীরা মহাকুমাকে খুলনা জেলার একটা মহকুমায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক সেনা প্রধান হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীয় করনের আওতায় সাতক্ষীরা মহকুমা বাংলাদেশের ৬৪ জেলার একটি জেলা হিসাবে মর্যাদা লাভ করে। বর্তমানে এ জেলায় ৭টি উপজেলা, ৮টি থানা, ৭৮টি ইউনিয়ন, ৯৬০টি মৌজা, ১৪২১টি গ্রাম, ও ২টি পৌরসভা আছে। এই জেলার ভূপ্রকৃতির অধিকাংশই সমতল। অল্প কিছু ভূমি অসমতল। একটি জেলায় মানুষের বসবাসের জন্য যাহাকিছু প্রয়োজন তার সবকিছুই এই জেলায় আছে। এ জেলার মাটিতে ভাল ফসল জন্মে। বিভিন্ন ধরনের ফল , শাক সবজি, উদ্ভিদ খাদ্য শস্য, মৎস্য সহ অন্যান্য ফসলাদি প্রচুর পরিমানে উৎপাদিত হয়। এই জেলার মানুষ অত্যন্ত নিরীহ, সৎভাবে জীবনযাপন করে। মনের ভিতর কোন দ্বিধা দ্বন্দ নেই। আতিথেয়তার দিক দিয়ে সাতক্ষীরার মানুষের কোন জুড়ি নেই। এই জেলার মানুষ অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়। এখানে কোন ধর্মীয় উন্মাদনা নেই। যার ধর্ম সেই পালন করে। মানুষের ভিতর কোন হানাহানি নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কোন দ্বন্দ নেই। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নানা ধর্মাবলম্বী, নানা পেশার, নানা ভাষার লোক বিভিন্ন সময়ে সাতক্ষীরা নামের জনপদে তাদের বসত গড়েছেন। সঙ্গত কারনেই তাদের কিছু কীর্তির ধ্বংসাবশেষ এখনও আছে এখানে। সংরক্ষনের অভাব, ঐতিহাসিক নিদর্শন ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার, লবনাক্ত আবহাওয়া, ধ্বংস ইত্যাদি কারনে বহু প্রাচীন নিদর্শন আজ বিস্তৃতির অতলে তবু এখনও নিদর্শন সমূহ টিকে আছে তা দেখে ও ইতিহাস পর্যালোচনা করে নির্দ্বিধায় এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। পরিশেষে আমি সাতক্ষীরা জেলায় সকল সম্প্রদায়ের কাছে, শিক্ষিত ব্যক্তিদের কাছে, সরকারী-বেসরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের কাছে, বিভিন্ন পেশার মানুষের কাছে এবং সর্বোপরি সকল শান্তিপ্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের কাছে আবেদন, আসুন আমরা সকলেই মিলে দ্বিধা দ্বন্দ ভুলে যেয়ে আমাদের ইতিহাসখ্যাত জেলা সাতক্ষীরাকে বাংলাদেশের মানচিত্রে একটি অন্যতম মডেল জেলা হিসাবে গড়ে তুলি।

লেখকঃ জহিরুল ইসলাম (শাহিন)
সহঃ অধ্যাঃ ইংরেজী
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ