HEADLINE
সাতক্ষীরার উৎপাদিত টমেটো যাচ্ছে রাজধানী’সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাতক্ষীরা সীমান্তে অপরাধ দমনে বিজিবি ও বিএসএফ এর পতাকা বৈঠক ঝাউডাঙ্গা হাইস্কুল জামে মসজিদের ওযুখানা নির্মাণ কাজ উদ্বোধন শ্যামনগরে বিদ্যুৎস্পর্শে কৃষকের মৃত্যু কাশ্মিরি ও থাইআপেল কুল চাষে সফল সাতক্ষীরার মিলন ঝাউডাঙ্গা সড়কে বাস উল্টে ১০জন আহত ঝাউডাঙ্গায় জমকালো আয়োজনে শুরু হচ্ছে পৌষ সংক্রান্তি মেলা কালিগঞ্জে শীতার্ত মানুষের পাশে ”বিন্দু” মাদ্রাসা শিক্ষক শামসুজ্জামানের বিরুদ্ধে ফের ছাত্র বলাৎকারের অভিযোগ স্বামী বিবেকানন্দ দর্শন আমাদের মুক্তির পথ : সাতক্ষীরায় ১৬০তম জন্মবার্ষিকী উৎসবে আলোচকরা
শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৫:৩০ অপরাহ্ন

নিয়ন্ত্রিত গতিই পারে রাস্তায় মৃত্যুর মিছিল কমাতে

ড. অজয় কান্তি মন্ডল / ৭১
প্রকাশের সময় : সোমবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৩

আশাশুনি হয়ে জেলা শহরের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে আমাদের গ্রামের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া পিচ ঢালাই করা সাতক্ষীরা টু ঘোলা-ত্রিমোহনী রাস্তাটি। কিছুদিন আগে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে এই রাস্তাটির। স্বভাবতই এ কারণেই রাস্তাটি এখনো পর্যন্ত চকচকে ঝকঝকে। এই মসৃণ রাস্তা দিয়ে বেপরোয়া গতিতে অনবরত ছুটে চলে মোটরসাইকেল, ইঞ্জিনচালিত ভ্যান, ইজিবাইক, সাইকেল, বাস সহ ইত্যাদি যানবাহন। সম্প্রতি কিছুদিন গ্রামে থাকার সুযোগ হয়েছিল। সেই সময়ে প্রায় প্রতিদিনই ভোরে উক্ত রাস্তায় হাঁটতে বের হতাম। ভোরের দিকে রাস্তা তুলনামূলক ফাঁকা থাকায় আমি ওই সময়টাকে হাঁটার জন্য বেঁছে নিই। যদিও আমার ভিতরে ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটা চলা করতে সবসময় একটা আতঙ্ক কাজ করে। কেননা অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে ঐ রাস্তায় বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। পৃথক তিনটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। আর আহত হয়েছেন প্রায় ১৫ জন। দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল ও ইঞ্জিনচালিত ভ্যানের কারণে। এই ইঞ্জিনচালিত ভ্যানগুলোর কথা একটু না বললেই নয়। আকারে স্বাভাবিক ভ্যানের চেয়ে দ্বিগুণ এই ভ্যানগুলোতে পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত ডিজেল চালিত স্যালো মেশিন লাগানো। যেগুলোতে চালকের গতি নিয়ন্ত্রণ করার মত কোন সুব্যবস্থা নেই। একরকম গ্রাম্য টেকনিশিয়ানদের দ্বারা তৈরি ভ্যানগুলো যখন শেষরাতে রাস্তায় বের হয় তখন পূর্ণ গতিতে চলতে থাকে। অন্ধকারের রাস্তায় চালকের দেখার জন্য ভ্যানগুলোতে কোন আলোর ব্যবস্থা নেই, আবার গতি রোধের তেমন কোন সুব্যবস্থা না থাকার সত্ত্বেও চালকের বেপরোয়া গতি রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটা বা বসে থাকা ব্যক্তির শরীরকে শিহরিত করে। মাঝেমধ্যে ঘটছে দুর্ঘটনা। যার কবলে পড়ে কেউ হাত, পা এমনকি মহামূল্যবান জীবন হারাচ্ছেন। মদ্দাকথা গ্রামাঞ্চলের মানুষও এখন বাড়ির বাইরে বের হয়ে মোটেও শঙ্কামুক্ত নন। কিছুদিন গ্রামে থাকার অভিজ্ঞতাতেই এমনটা উপলব্ধি হয়েছে।

ভোরে আমি যখন হাঁটতে বের হই তখন বহু দূর হতে কানে আসা সজোরে ইঞ্জিনের আওয়াজ বেশ আগেই এই ইঞ্জিনভ্যানের উপস্থিতি টের পাইয়ে দেয়। এরপর হাওয়ার বেগে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে পাশ অতিক্রম করে চলে যায়। কিছুদিন আগে রাস্তা হতে বেশ দূরে বসে গল্প করছিলেন তিনজন ব্যক্তি। বেপরোয়া গতির এক ইঞ্জিনভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনজনের দিকে ধেয়ে আসে। এতে করে একজন জায়গায় মারা যান অন্য দুইজন আহত হন। এরকম ঘটনা গ্রাম গঞ্জের রাস্তায় অহরহ ঘটছে। আমার জানা নেই রাস্তায় চালাতে এসব ইঞ্জিনভ্যানের আদৌ কোন অনুমোদন লাগে কিনা। যদি অনুমোদন লাগে তাহলে অবশ্যই এদের রাস্তায় ওঠার আগে গতির নির্ধারিত সীমা, ভ্যানগুলোর রাস্তায় চলাচলের ফিটনেস আছে কিনা সেগুলো কর্তৃপক্ষের যাচাই করে তবেই অনুমতি দেওয়া উচিৎ। আরও একটা জিনিস খেয়াল করেছি। এসব ইঞ্জিনচালিত ভ্যানের অধিকাংশ চালক অপ্রাপ্তবয়স্ক। যাদের বয়সসীমা ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। এই বয়সের বাচ্চারা এমন বেপরোয়া গতিতে ইঞ্জিনভ্যান নিয়ে রাস্তায় নামতে পারে কিনা সেই বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা উচিৎ। যদি এগুলোর অনুমোদন না দেওয়া হয় তাহলে অচিরেই এধরণের যানবাহন বন্ধ করা উচিৎ। কেননা গ্রামাঞ্চলের অলিগলিতে এখন ব্যাটারি চালিত ভ্যান ও ইজিবাইক পৌঁছে গেছে। যেগুলোর গ্রহনযোগ্য গতি ও আরামদায়ক ভ্রমনে মানুষ এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তবে এক্ষেত্রেও কিছু যথোপযুক্ত নিয়মকানুন প্রয়োগ করে তবেই ব্যাটারি চালিত ভ্যান বা ইজিবাইক চলাচলের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। কেননা এগুলোতে জনগণের আরামদায়ক ভ্রমন নিশ্চিত হলেও অহরহ যাতে দুর্ঘটনা না ঘটে সেজন্য চালকের দক্ষতা সহ এসকল গাড়ির ফিটনেস অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিৎ।

মাস খানিক আগে ওই একই রাস্তায় এমন এক হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে গেছে যেটা মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর। ৭ জন যুবকের একটি গ্রুপ রাস্তার পাশের একটি কালভাটের উপর বসে গল্প করছিলেন। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই সরকারী চাকুরীজীবী। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে এমন সময় উচ্চ গতির একটি মোটরসাইকেল ওই সাতজনের উপর দিয়ে চলে যায়। এদের সবাই গুরুত্বর আহত হন। একজন জায়গায় মারা যান। যিনি ছিলেন সরকারী প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। দুইজনের অবস্থা এখনো আশঙ্খা মুক্ত নয়। রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী এই মোটরসাইকেলগুলোর গতি দেখলে যেকেউ বিস্মিত হবেন। রাস্তাটির দুই পাশ দিয়ে লোকালয়। যেকোন মুহূর্তে রাস্তায় মানুষ আসবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মোটর সাইকেলের চালকদের এসব বিষয়ে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তাছাড়া রাস্তাটি তুলনামূলক সরু হওয়ায় কোন লেনে বিভিক্ত নয়। লেনের বিভক্তিকরণ কোন রকম নির্দেশক চিহ্ন রাস্তায় না থাকায় মোটরসাইকেল চালকেরা ইচ্ছেমত সুযোগ পেলেই লেন পরিবর্তন করছে। রাস্তাটিতে যেহেতু সর্বোচ্চ কত বেগে গাড়ি চলবে তারও কোন সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই সেহেতু মোটরসাইকেলের চালকেরা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ইচ্ছেমত গতিবেগ তুলছে। লোকালয়, ফাঁকা জায়গা, বাজারের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়ও তাঁদের গতির কোন হেরফের নেই। বিশেষ করে উঠতি বয়সের তরুণেরা সবচেয়ে বেপরোয়া গতিতে মোটর সাইকেল চালায়। আরও ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, এসব তরুণদের কারও তেমন সময়ের তাড়া নেই। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে বা হাতের দরকারি কাজ সারতে সময়ের তাড়া না থাকলেও শুধুমাত্র নিজেদের কারিশমা দেখানো এবং নিজেদের বাহাদুরি জাহির করতে তাঁদের বেপরোয়া গতিকে বেঁছে নেওয়া।

কর্তৃপক্ষের উচিৎ এসব মোটরসাইকেলের সর্বোচ্চ গতিসীমা বেঁধে দেওয়া। যেটার ব্যত্যয় ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল, নির্দিষ্ট হারে জরিমানা সহ আরও কিছু গুরু দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রাখা যেতে পারে। তাহলে খুবই সহজে এসব গাড়ির গতি কমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস। এসব মোটরসাইকেলের অহরহ ঘটা দুর্ঘটনায় শুধুমাত্র যে পথচারীই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তা কিন্তু নয়। দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল চালক বা তাঁর পাশে বসে থাকা ব্যক্তিও কিন্তু গুরুত্বর হতাহত হচ্ছেন। অনেকেই না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছেন। তাই নিয়ন্ত্রিত গতি সকলের জন্য মঙ্গলজনক হবে। এ বিষয়ে অবশ্যই জেলা পর্যায়ের দায়িত্বরত ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের রাস্তাগুলোর লোকালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাশে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর গতিরোধক নির্মাণ করা যেতে পারে। তাহলে সহজেই সকল গাড়ির গতি কমে আসবে। আর এই গতিরোধকই একমাত্র যানবাহনের সহনশীল গতি এনে দুর্ঘটনার হার কমাতে পারে। গ্রামাঞ্চলের মানুষের কারও এত বেশি তাড়া থাকার কথা নয় যেখানে রাস্তার গতিরোধকে মানুষের সময় অপচয় হবে এই ভ্রান্ত ধারণা ঝেড়ে ফেলা উচিৎ। ঢাকা হতে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সময় দেখেছি সমস্ত রাস্তায় গতিরোধক দেওয়া আছে। আর সেকারণে গাড়ির গতিও সহনীয় থাকে। ফলশ্রুতিতে দুর্ঘটনাও তুলনামূলক কম ঘটে। যদি মহাসড়কে গতিরোধকের ব্যবস্থা থাকে তাহলে গ্রাম্য এসব রাস্তায় কেন থাকবেনা সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

এখানে শুধুমাত্র ইঞ্জিনচালিত ভ্যান ও মোটরসাইকেলের উদাহরণ টানলেও মাইক্রোবাস, বাস, ট্রাকে এমনকি ট্রেনেও অহরহ দুর্ঘটনা ঘটে বহু মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় সংগঠিত যানবাহনের ০.৭৯ শতাংশ মোটরসাইকেলে, ০.৭৬ শতাংশ কার-জিপ মাইক্রোবাসে, ০.২১ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার বিভিন্ন কারণের মধ্যে বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক অভারটেকিং, রাস্তাঘাটের ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, রেলক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা, রাস্তায় ফুটপাথ না থাকা বা ফুটপাথ বেদখলে থাকা, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, ছোট যানবাহন বৃদ্ধি, সড়কে চাঁদাবাজি, রাস্তার পাশে হাট-বাজার, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন রাস্তায় নামানো এবং দেশব্যাপী নিরাপদ ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তে টুকটুকি, ইজিবাইক, ব্যটারিচালিত রিকশা, মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা, ইঞ্জিনচালিত ভ্যান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এই সবগুলো সমস্যা একসাথে সমাধান করা না গেলেও প্রধান কারণগুলো ধাপে ধাপে চিহ্নিত করে সেগুলোর দিকে কর্তৃপক্ষের সজাগ দৃষ্টি দিলে সড়ক দুর্ঘটনা বহুগুণে কমে আসবে বলে সকলের বিশ্বাস।

লেখকঃ ড. অজয় কান্তি মন্ডল
গবেষক ও কলামিস্ট।

With Regards,
Dr. Ajoy Kanti Mondal
Senior Scientific Officer
Leather Research Institute (LRI)
Bangladesh Council of Scientific & Industrial Research (BCSIR)
Savar, Dhaka-1350, Bangladesh


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ