HEADLINE
১৯ নারী ৩ বছর পর বেনাপোল ইমিগ্রেশন দিয়ে দেশে ফেরত পুজামন্ডপ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ভাংচুরের প্রতিবাদে সাতক্ষীরায় মানববন্ধন পাটকেলঘাটায় যাত্রীবাহি বাস খাদে পড়ে সুপার ভাইজার নিহত : আহত ১০ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী আজ দীর্ঘ ১০ বছর পর অবশেষে সাতক্ষীরার নিউ মার্কেট’র জমির মামলার রায় দিল আদালত সাতক্ষীরায় ছাত্রলীগের সম্প্রীতি সমাবেশ ও শান্তি শোভাযাত্রা আশাশুনির ৩ ইউনিয়নের ১০ হাজার পরিবার আবারও পানি বন্দী শ্যামনগরে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে মা ছেলে আহত সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সম্প্রীতি রক্ষা দিবস পালিত মথুরাপুরের জয়নাল বেকারীতে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে খাবার
শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ১০:১৮ পূর্বাহ্ন

শুভ শক্তির সূচনা ও সকল অশুভ শক্তির বিনাশ হোক

অজয় কান্তি মন্ডল / ৬৭
প্রকাশের সময় : বুধবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২১

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ‘দুর্গা পূজা’। এই উৎসবের শুভ সূচনা পূজার ঠিক ছয় দিন আগে ‘মহালয়া’র মধ্য দিয়ে হলেও সমস্ত শরত জুড়ে প্রকৃতির মাঝে বিরাজ করে অনাবিল এক স্নিগ্ধতা। তাইতো, শরত সকলের কাছে নিয়ে আসে শান্তির বার্তা নিয়ে। একদিকে গরমের দাবদাহ থেকে মুক্তি অন্য দিকে শীতের আগমনী বার্তা মনকে ভরে দেয় প্রশান্তিতে। সেইসাথে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা এবং মৃদু বাতাসে দোল খাওয়া কাশ ফুলের শুভ্রতায় শরত যেন প্রকৃতিতে তার আপন মহিমা নিয়েই হাজির হয়। প্রকৃতির এই শুভ লগ্নে শারদীয় দুর্গা উৎসব বাঙালির মনে এনে দেয় এক অন্যরকম অনুভূতি। প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে যে অনুভূতির ভিতর শোভা পায় শারদ উৎসবের প্রকৃত আমেজ।    

কালে কালে বদলেছে উৎসবের ধরন, উৎসবের রঙ। কিন্তু মনের মণিকোঠায় শৈশবের দুর্গা উৎসবের সেই স্মৃতি আজও অমলিন। মহালয়ার প্রারম্ভে দুর্গা পূজার শুভ সূচনায় সনাতনীদের যে আবেগ ও অনুভূতি কাজ করে সেগুলো সত্যিই ভোলার নয়। ছোট থাকতে বেশ আগে থেকেই অনেক প্রস্তুতি থাকত মহালয়াকে ঘিরে। মহালয়ার আগের রাতে শুধু প্রতিক্ষার প্রহর গুনতাম, কখন ভোর হবে? কখন মহালয়া দেখতে যাব? এই আনন্দে সেই রাতের ঘুমটাও ঠিক মত হত না। তবে প্রতিবারই খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যেত বাবার রেডিও থেকে সর্বোচ্চ শব্দে ভেসে আসা ‘বাণী জয়রাম’ এর চণ্ডীপাঠের সেই সুমধুর ধ্বনি শোনার মধ্য দিয়ে। চণ্ডীপাঠের সুর শোনা মানেই বিছানায় শুয়ে থাকা আর সম্ভব হত না। একরকম তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে উঠে বাইরে বের হওয়া। আশপাশের সকল বাড়ি থেকে শোনা যেত চণ্ডীপাঠের এই পর্ব।

চণ্ডীপাঠের পর্ব শেষ হওয়ার সাথে সাথে ‘কলকাতা দূরদর্শন’ থেকে টেলিভিশনে মহালয়ার দিন ভোরে দেবী দুর্গার আবির্ভাব সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত চলচিত্র প্রচারিত হত। যে চলচিত্রের ভিতর ‘পৃথিবী থেকে অশুভ শক্তির বিনাশে মহামায়া দুর্গাদেবীর আবির্ভাব’ সকলের কাছে ছিল এক অভূতপূর্ব ভালো লাগা। তাইতো বেশ আগে থেকেই ঠিক করে রাখতাম গ্রামের কোন বাড়ি নির্বিঘ্নে মহালয়ার অনুষ্ঠান দেখা হবে। কেননা, তখনকার দিনে সমগ্র গ্রাম জুড়ে ২-৩ জনের বাড়ি টেলিভিশন ছিল। আর আমাদের মত গ্রামের সকল ছেলে, মেয়ে, বউ, ঝি, বয়স্ক, তরুন সবাই এই মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠান দেখার প্রহর গুনত। তাই মহালয়ার সময়ে কোন রকমে কোণঠাসা হয়ে কখনো জানালার ফাঁক দিয়ে কখনো বা বেড়ার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকত সে দিনের ব্যাটারি চালিত সেই সাদাকালো টেলিভিশনের পর্দায়। সকল কিছু ছিল যেন এক অসাধারণ ভালো লাগা।

পূজার বহু আগে থেকে বাবার কাছে বায়না করতাম নতুন জামা-প্যান্ট বানিয়ে দেওয়ার জন্য। বাড়ীর কাছেই ছিল দর্জির দোকান। সেখানে গিয়ে জামা-প্যান্টের মাপ দিয়ে আসতাম। এরপর প্রায় প্রতিদিনই দর্জির দোকানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসতাম পূজায় পরার জন্য নতুন জামা-প্যান্ট তৈরি হল কিনা। যেদিন জামা-প্যান্ট হাতে পেতাম সেদিন একবার পরে দেখতাম সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। পূজার দিনগুলোতে নতুন জামা পরবো ভেবে আবার সেভাবে ভাঁজ করে রেখে দিতাম। পূজার শুরুতেই মামাবাড়ি ছিল আমাদের গন্তব্য। সেই সময়ে দেখতাম দাদু পূজা উপলক্ষে আমাদের নিতে আসত। দাদু কবে আসবে সেজন্য আমরা তিন ভাই বোন অধীর আগ্রহে শুধু পথ চেয়ে বসে থাকতাম। সারাদিন পথ চেয়ে বসে থাকার পরে সন্ধ্যায় সবার মন খারাপ হয়ে যেত দাদু না আসাতে। এরকম ঘটনা বহুবার ঘটেছে। এরপর দেখতাম দাদু পূজার আগ মুহূর্তে ঠিকই চলে এসেছে।

দাদু নিতে আসা মানে আমাদের ভাই বোনের আর কেউ আটকে রাখতে পারত না। মা কে বহু কষ্টে ম্যানেজ করে পূজা শুরুর প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে মামা বাড়ি বেরিয়ে পড়তাম। মামাবাড়ির পথেই পড়ে মাসিমাদের বাড়ি। কোন কোন বার মাসিমাদের সাথে এক হয়ে মামাবাড়ি গিয়ে হাজির হতাম। মামাবাড়ির পূজার আনন্দটা বহুগুনে বাড়িয়ে দিত মাসতুতো ভাই ‘গোপাল’। প্রায় সমবয়সী গোপালের সাথে এক হয়ে পূজায় কত যে দুরন্তপনা করেছি সেটা বলে শেষ করা যাবেনা। পূজার সময়ে দাদু দিদিমারা সবাই মিলে কেউ ৫ টাকা কেউ ১০ টাকা করে আমাদের সকল ভাইবোনদের দিত। ৫ টাকা বা ১০ টাকা পাওয়ার পরে আমাদের আনন্দ বহুগুনে বেড়ে যেত। পূজা উপলক্ষে বহুদিন আগে থেকে নিজেদের জমানো ১০-২০ টাকার সাথে দাদু দিদিমাদের দেওয়া টাকা গুলো মিলে বড় একটা অংকে গিয়ে দাঁড়াত। তাই নবমী পূজার দিনে দুপুরে ভুরিভোজ সেরেও খুব ব্যস্ত হয়ে পড়তাম টাকা গুলো শেষ করায়। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে যেদিন পূজার সমাপ্তি ঘটত সেদিনের অনুভূতিটা থাকত খুবই খারাপ। একরকম মনমরা হয়ে যেতাম সকলে। পূজা শেষে যখন মামাবাড়ি থেকে সবাই বাড়ি ফিরতাম সেদিন সকাল থেকে সবাই কান্না করতাম। মাসতুতো ভাই বোনদের ছেড়ে আসার কষ্ট, মামাবাড়ির সকলের ছেড়ে আসার কষ্টে যেন নিজেদের আটকাতে পারতাম না।

শৈশব থেকে কৈশরে উৎসবের ধরন ও বেশ বদলেছে। মামাবাড়ির আনন্দের চেয়ে বন্ধু বান্ধবদের সাথে আশপাশের মন্ডপ গুলোতে পূজা দেখে বেশি মজা পেতাম। পূজার মেলাতে গিয়ে সবাই একসাথে মিলে গল্প গুজব করে, ভাজাপোড়া ও মিষ্টিমিঠাই খেয়ে বেশ রাত করেই বাড়ি ফিরতাম। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকল বেশ কিছুদিন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন ও সারাবছর প্রহর গুনতাম কখন বাড়ি যাব পূজা দেখতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ঢাকেশ্বরী মন্দির সহ আশপাশের বেশ কিছু স্থানে বেশ আড়ম্বরে পূজা উদযাপন হলেও বাল্য বন্ধুদের সাথে পূজা দেখার অনুভূতিটা ছিল নিঃসন্দেহে অন্যরকম। তাই সকল বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে বেরিয়ে পড়তাম বাড়ির পানে। পরবর্তীতে পরিবার হয়েছে, সেইসাথে পূজার আনন্দে ও বেশ ভিন্নতা এসেছে। তাইতো, পূজার প্রস্তুতি স্বরূপ আগে থেকে কোথায় কয়দিন সময় কাঁটাতে হবে সেটার হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। একদিকে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে, আবার বাড়ি থাকতে হবে, এসকল হিসাব মেলাতে মেলাতে বেশ ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে পূজা চলে গেছে।

শৈশবের দিনগুলো থেকে এখন উৎসব পালনে ব্যস্ততা বহুগুনে বেড়ে গেছে। যেখানে, মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠান দেখার জন্য কেউ টেলিভিশনের দূরদর্শন চ্যানেলের পানে চেয়ে থাকেনা। দর্জির দোকানে কাপড় বানাতে দিয়ে কতদূর কাজ এগুলো সেটার জন্য বার বার উঁকি দেওয়া লাগেনা। ছোটবেলার মত এখন আর মামাবড়ি মাসতুতো ভাই বোনদের কেউ একত্রিত হয়না। সেই সময়ে বড়দের থেকে পূজায় আগত মেলায় খরচের উদ্দেশ্যে বহু কাঙ্ক্ষিত ১০-২০ টাকার জন্য এখন আর বসে থাকা লাগেনা। ইচ্ছে করলে এর থেকে ঢের বেশি যখন তখন খরচ করতে পারি। তবুও কেন জানি মনে হয় শৈশবের আনন্দটাই অনেক ভালো ছিল।

বিগত চার বছর ধরে পূজার কোন আমেজ আমরা বুঝতে পারিনা। প্রথমে দুই বছর ভারতীয় ও নেপালী সনাতনী বন্ধুদের সাথে মিশে কিছু আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ হলেও এখন তাদের সবাই প্রায় দেশে। তাই এখন পূজার দিনগুলো পার করতে বেশ কষ্ট হয়। অজানা চাপা কষ্টে মন ডুকরে কেঁদে ওঠে। তারপরেও নিজেদের মত করে সবকিছুকে মানিয়ে নিয়ে চলতে থাকি। অপেক্ষার প্রহর গুনি আগামী পূজার জন্য। যেখানে সকলের সাথে মিলব প্রাণের উচ্ছ্বাসে। সকল অশুভ শক্তির বিনাশ হোক। মঙ্গলময় হয়ে উঠুক বিশ্ব। শুভ শারদোৎসব।

লেখকঃ

অজয় কান্তি মন্ডল,

গবেষক,

ফুজিয়ান এগ্রিকালচার এন্ড ফরেস্ট্রি ইউনিভার্সিটি,

ফুজো, ফুজিয়ান, চীন।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ