রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ০৫:০৭ অপরাহ্ন

ন্যাটোর সৃষ্টি হয়েছে রাশিয়াকে দাবিয়ে রাখার জন্য

জহিরুল ইসলাম শাহীন / ৬৮
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২১ জুন, ২০২২

সাধারণত ন্যাটো সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না বা বোঝার চেষ্টা করি না। রাশিয়া কেন এত ন্যাটো বিরোধী সেটাও বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি না। ঘধঃড় কে কেন্দ্র করেই মুলত যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা অনেক দেশের সাথে এবং ইউরোপের মোটামুটি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী দেশ গুলোর মধ্যে একটা মনস্তাত্তি¡ক বা ঠান্ডা লড়াই- রাশিয়ার আছে যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সাগর পথে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগের বাধা হিসাবে কাজ করে। ন্যাটোর অর্থ হলো উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তার জোট যার ইংরেজি ঘড়ৎঃয অঃষধহঃরপ ঞৎবধঃু ঙৎমধহরংধঃরড়হ ড়ৎ ঘঅঞঙ ফরাসি ড়ৎমধহরংধঃরড়হ ফঁ ঞৎধরঃব ফব অঃষবহঃরয়ঁব ঘড়ৎফ বা (ঙঞঅঘ)। ১৯৪৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত একটি সামরিক সহযোগিতার জোট। ন্যাটো জোটভুক্ত দেশ গুলোর পারস্পারিক সামরিক সহযোগিতা প্রদানে অঙ্গীকার বদ্ধ। এর সদর দপ্তর বেলজিয়াম এর রাজধানী ব্রাসেলসে। এবং ন্যাটো সম্পর্কে নীতি বাক্য মুক্ত মনে বিবেচনা অর্থাৎ অহরসঁং রহ পড়হংঁষবহফড় ষরনবৎ. ন্যাটোর অধীনে সদস্য দেশ মোট ৩০ টি যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মত শক্তিশালী দেশ রয়েছে। ন্যাটোর বর্তমানে সামরিক কমিটির চেয়ারম্যান এয়ার চিফ মার্শাল স্টুয়র্টপিচ এবং মহাসচিব জেমস স্টলটেন বার্গ- এবং এর দাপ্তরিক ভাষা ইংরেজী এবং ফারসি। আটলান্টিক মহাসাগরের দুইপাড়ে অবস্থিত উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এই জোটের সদস্য। এ ছাড়া তুরস্ক ও এই জোটের সদস্য। প্রতিষ্ঠাকলীন সদস্য ১২টি। এই সামরিক জোটের সহযোগী সদস্য দেশ রাশিয়া সদস্য নয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তুরস্ক এবং আলবেনিয়াই কেবল মুসলিম দেশ। ন্যাটোর সদস্য দেশ গুলোর মধ্যে ২৮টি ইউরোপের এবং বাকি দুইটি দেশ উত্তর আমেরিকার। সর্বশেষ যোগ দেয় উত্তর মেসিডোর্নিয়া ২৭/০৩/২০২০ ইং তারিখে। ২০০৯ সালের পয়লা এপ্রিল আলবেনিয়া এবং ক্রোয়েশিয়া ন্যাটোতে যোগ দেয়। ন্যাটোর সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর খরচ পৃথিবীর সকল দেশের সামরিক খরচের প্রায় সত্তর ভাগ। আসলে ন্যাটো একটি যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা যার মাধ্যমে এর স্বাধীন সদস্য রাষ্ট্রগুলো কোন বহিরাগত পক্ষের আক্রমনের জবাবে পারস্পারিক প্রতিরক্ষার জন্য সর্ব সম্মত সিদ্ধান্ত নেয়। ন্যাটো মূলত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ¯œায়ু যুদ্ধের সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের হুমকির জবাব দেয়ার জন্য। ১৯৯০ দশকের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ও ঐ জোট টি এখনও পর্যন্ত টিকে আছে। বর্তমান সময়ে ন্যাটো বলকান, মধ্যপ্রাচ্য দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকাতে সামরিক অভিযানে জড়িত রয়েছে। প্রতিষ্ঠার প্রথম দুই বছর ন্যাটো একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে পরিচিত ছিল। কিন্তু কোরীয় যুদ্ধের পর ন্যাটোর অন্তর্ভূক্ত সদস্যরা চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুইজন সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডারের অধীনে একটি সমন্বিত সামরিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়। ন্যাটোর প্রথম মহাসচিব ছিলেন লর্ড ইসমে তিনি ১৯৪৯ সালে বলেন যে, এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হল রাশিয়াকে দূরে রাখা এবং আমেরিকানদের কাছে আনা এবং জার্মানদের ডাবিয়ে রাখা। ১৯৮৯ সালে বার্লিন দেওয়াল ভেঙ্গে ফেলা হলে ন্যাটো যুগো¯øাভিযার দিকে মনোনিবেশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বসনিয়ায় ন্যাটো মধ্যস্ততা মূলক সামরিক অভিযান চালায়। ন্যাটো প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের হাত থেকে পশ্চিম বার্লিন এবং ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ন্যাটো হলো এমন একটি যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি যে চুক্তির আওতায় জোট ভূক্ত দেশগুলো পারস্পারিক সামরিক সহযোগিতা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ এর সন্ত্রাসী হামলার পর ন্যাটো সদস্যরা তাদর প্রতিশ্রæতি রক্ষায় মাঠে নেমেছিল। ন্যাটোর সাথে রয়েছে এমন প্রত্যেকটি সদস্য রাষ্ট্র তাদের সামরিক বাহিনীকে যে কোন পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখতে বদ্ধ পরিকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম বিজয়ী সোভিয়েত ইউনিয়ন। যুদ্ধে জয়লাভ করার কারনে পূর্ব ইউরোপ জুড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপুল পরিমাণ সেনা রয়ে যায়, যে কারনে পূর্ব জার্মানি সহ বেশ কয়েকটি দেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর জার্মানীর রাজধানী বার্লিন দখল নেয় বিজয়ী দেশগুলো। এরপর ১৯৪৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী জোসেফ স্ট্যালিন পশ্চিম বার্লিনের বিরুদ্ধে অবরোধ শুরু করেন। আর সে সময়ে পশ্চিম বার্লিন এলাকা ছিল তৎকালীন মিত্র শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রনে। কিন্তু পুরো এলাকাটি অবস্থিত ছিল সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত পূর্ব জার্মানিতে। এটা অতি সহজে অনুমান করা যায় যে, সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সেখানে যে ধরনের সংঘর্ষ হবার শংকা করা হয়েছিল তা এড়ানো গিয়েছে। কিন্তু ঐ সংকট সোভিয়েত শক্তিকে রুখে দেবার জন্য বেশ কিছু দেশকে সামরিক সহযোগিতার ব্যপারে একত্র হতে ভূমিকা রেখেছিল, যা একটি রাজনৈতিক ও সামরিক জোট সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল উত্তর আমেরিকার ১২টি দেশ এবং ইউরোপের ১০টি দেশ মিলে এই রাজনৈতিক ও সামরিক জোট গঠন করে। ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন ১২টি দেশ হলো- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা, নরওয়ে, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড, পর্তুগাল, আইসল্যান্ড এবং লুকেসম বার্গ প্রাথমিক ভাবে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার লন্ডনে স্থাপন করা হলেও ১৯৫২ সারে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে স্থানন্তর করা হয়। এর পর পাকাপাকি ভাবে ন্যাটো হেডকোয়ার্টার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে নিয়ে যাওয়া হয় ১৯৬৭ সালে। ন্যাটোর যে বর্তমান হেডকোয়ার্টার রয়েছে সেখানে বছরের ছয় হাজারের ও বেশী সেমিনার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে ন্যাটো প্রতিষ্ঠিত হবার পর ১৯৫২ সালে তুরস্ক এবং গ্রীস যোগ দিতে চাইলে, দেশ দুটোকে সদস্য করার মাধ্যমে জোটটি আরও প্রসার লাভ করে। এরপর ১৯৫৫ সালে যুক্ত হয় পশ্চিম জার্মানি যা এখন জার্মানি হিসাবে পরিচিত। পশ্চিম জার্মানি যোগ দেবার পর দীর্ঘ ২৭ বছর পর ন্যাটো নতুন সদস্য অন্তর্ভূক্ত করতে সক্ষম হয় ১৯৮২ সালে। ১৯৮২ সারে নতুন সদস্য হয়ে ন্যাটোকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তোলে ইউরোপের একটি উন্নত দেশ স্পেন। এর পর দীর্ঘ সময় ধরে ন্যাটোতে নতুন কোন দেশ যোগ দেয় নাই বা সদস্য ভুক্ত হয় নাই।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর ১৯৯৯ সাল থেকে এই সংগঠন বা সংস্থা সাবেক পূর্বাঞ্চলীয় জাতি রাষ্ট্র গুলোকে ও সদস্য করে নেয়। ১৯৯৯ সালে তিনটি দেশ চেক রিপাবলিক, হাংগেরী এবং পোল্যান্ড যোগ দেয়। শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ ন্যাটো প্রতিষ্ঠার পর ২০০৪ সালে সবচেয়ে বেশী সদস্য গ্রহন করে। ২০০৪ সালে ৭টি দেশকে ন্যাটোর সদস্য পদ দেওয়া হয়। ২০০৪ সালে যে সকল দেশ ন্যাটোর সদস্য হয়, সে দেশ গুলো হলো- বুলগেরিয়া, এস্তেনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া, ¯েœভাকিয়া এবং ¯েøাভেনিয়া। বর্তমানে যে কোন ইউরোপিয়ান দেশের জন্য সদস্য পদ গ্রহন উন্মুক্ত রয়েছে যদি সে দেশ গুলো নিরাপত্তার ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ন্যাটোর লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও নীতি মালার সাথে সম্মত থাকে। এক্ষেত্রে বিশেষ কোন চেকলিস্ট নেই। ন্যাটো যে সকল ভিত্তিমূলক দফার ওপর মননিবেশ করেছে তা রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা সমন্বিত প্রতিরক্ষা দ্য ট্রান্স আটলান্টিক লিংক এবং কৌশল গত ধারণা। ন্যাটো যেভাবে বলছে, “আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তা আমাদের ভালো থাকার চাবিকাঠি।” ন্যাটোর মূল উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক এবং সামরিক উভয় উপায়ে এর সদস্যদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা। ন্যাটো গনতান্ত্রিক মূল্যবোধ কে উৎসাহিত করে এবং সদস্য দেশ গুলোর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করে সমস্যার সমাধান। এ প্রতিষ্ঠানটি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পারিক বিশ্বাস গড়ে তোলার মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে সংঘাত প্রতিরোধ করতে সক্ষম। সদস্য দেশ গুলোর মধ্যে বিবাদের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য ন্যাটো প্রতিশ্রæতি বদ্ধ। এক্ষেত্রে যদি কুটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় তাহলে সংকট ব্যবস্থাপনা পরিচালনার জন্য সামরিক ক্ষমতার প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হবে ন্যাটো। ন্যাটো প্রতিষ্ঠাকালিন ওয়াশিংটন চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অথবা জাতি সংঘের আদেশের আওতায় কোন একটি সদস্য দেশ বা অন্যান্য দেশ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা ও পরামর্শে এ সামরিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। ন্যাটো হলো ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর একটি জোট। এটি এই দুইটি মাহাদেশের মধ্যে একটি অনন্য সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে দেশ গুলোর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরামর্শ ও সহযোগিতা করতে এবং বহুজাতিক সংকট ব্যবস্থাপনা একসাথে পরিচালনা করতে সাহায্য করে। সিদ্ধান্ত এবং পরামর্শ অপারেশন এবং মিশন্ড অংশিদারিত্ব এবং হুমকি মোকাবেলার সক্ষমতার বৃদ্ধি করাও ন্যাটোর প্রধান উদ্দেশ্য। ন্যাটো যদি ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের সংস্থা তবুও এর পরিসর বিশ্বব্যাপী। পরিশেষে আমরা সহজেই বলতে পারি ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত যতগুলো দেশ ই থাকুন না কেন এটা স্থায়ী হবে না কারন যুক্তরাষ্ট্র কখনোই চাইবে না তাদের স্বার্থ ত্যাগ করে ইউরোপের জন্য কিছু করা। আবার এটাও ঠিক যুক্তরাষ্ট্র কখনোও চাইবেনা ট্রান্স আটলান্টিক লিংকটি না থাকুক কারন ইউরোপ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের একটি ভাল কার্যকর কৌশল ন্যাটো ছাড়া তাদের সামনে আর দ্বিতীয় টি নেই। রাশিয়াকে ঠেকানোর পাশাপাশি চীনকে মোকাবেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্র বলে বিবেচিত দেশগুলোর জন্য ন্যাটো হলো একটি বড় রকমের শক্তি। সর্বোপরি আমি মনে করি ন্যাটো ইউরোপিয়ান দেশ গুলোর মধ্যে একটি শক্ত সংগঠনে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর সকল দেশ ন্যাটোর আওতায় আসুক তাহলে এই পৃথিবী হবে মানুষের, হবে না পরমানু অস্ত্রের, হবে না যুদ্ধ, হবে না গোলাগুলি, হবে না খুন, হবে না দখল, হবে না পেশী শক্তির মহড়া, অনেক কথাই বলতে ইচ্ছে করে কিন্তু বলে কি লাভ, কে শোনে কার কথা। শুধু বলি পৃথিবী হোক শান্তিময় ও সুখের ঠিকানা।

লেখকঃ জহিরুল ইসলাম শাহীন
সহঃ অধ্যাপক
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ