HEADLINE
কালিঞ্চী এ. গফ্ফার মাধ্যঃ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন বন্দে আদালতে মামলা বৈকারীতে ১’শ পিস ইয়াবাসহ চোরাকারবারি গ্রেপ্তার রাত পোঁহালেই দেবহাটা প্রেসক্লাবের নির্বাচন সাতক্ষীরায় ছাত্রলীগ নেতাকে অস্ত্রকান্ডে ফাঁসিয়ে ভারতে পালালেন মূলহোতা নির্বাচন নিয়ে ভাবার কিছু নেই, আমরা গণতান্ত্রিক দল : সাতক্ষীরায় আ.ক.ম মোজাম্মেল হক কুলিয়ায় পানিতে ভাসছে কাফনের কাপড় পরিহিত লাশ সাতক্ষীরায় দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা: তদন্ত পিবিআইতে সাতক্ষীরায় খোলপেটুয়া নদীর বেড়ী বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত কলারোয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ২৫ ইভটিজিং প্রতিরোধে আমাদের করণীয়
রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ০৬:৫১ অপরাহ্ন

জাতীয়তাবাদ যেমন দুর্ভোগের, তেমনি অভিজ্ঞতারও

জহিরুল ইসলাম শাহীন / ২০৭
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৯ জুলাই, ২০২২

আমরা মোটামুটি ভালভাবে জানি আসলে জাতীয়তাবাদ কী। আমরা যতটা জানার চেষ্টা করি তার চেয়ে অধিক বুঝার চেষ্টা করি। কেননা, জাতীয়তাবাদ আমাদের জন্য অত্যন্ত অভিজ্ঞতার ব্যাপার। আবার জাতীয়তাবাদ দুর্ভোগেরও ব্যাপার। আমরা পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ভূক্তভোগী বটে। হিটলার মুসোলিনীর আগ্রাসী ও আক্রমনাতœক জাতীয়তাবাদের সংগে বিশ্বের পরিচয় এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। ফিলিস্তিনীদের প্রতি নিয়ত মোকাবিলা করতে হচ্ছে ইসরাইলের জাতীয়তাবাদী নিষ্ঠুরতাকে। এমনকি জজ বুশ ও আমেরিকান জাতীয়তাবাদের পতাকা বিশ্ব জয়ে দেশ বিদেশ বের হয়েছিলেন। এসব নেতিবাচক দিক। জাতীয়তাবাদের কুফল যেমন এর মধ্যে রয়েছে তেমনি সফল দিক ও আছে অর্থাৎ ইতির দিক ও আছে। সেটা হলো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একটা নিজস্ব জায়গা। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার যুগে আন্তর্জাতিক ভাবে শক্তিশালী করাবর জন্য জাতীয়তাবাদ প্রয়োজন। কেননা বিশ্বায়ন হচ্ছে সা¤্রাজ্যবাদদেরই আরেকটি রূপ যা এক করবার নামে বিশ্বকে সত্যিকার অর্থে গ্রাম্য, বৈচিত্রহীন ও সংকীর্ন করে তুলতে চায়। অন্য দিকে আন্তর্জাতিকতা সকল জাতি সত্তার নিজস্বতাকে মানে ও সম্মান করে। জাতিতে জাতিতে সহযোগিতা ও সহমর্মিতা তৈরি করতে চায়, তাই সে গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের শত্রæ নয়, ঘনিষ্ঠ মিত্র বটে, পুঁজির কোন দেশ নেই, কিন্তু মানুষের তা আছে। সে দেশ যদি কেবল কল্পনারই হয় তবুও। পুঁজিবাদ এমন একটি ব্যবস্থা বা প্রক্রিয়া যে শ্রমিক শ্রেণীকে গৃহ হারা উৎপাটিত ও বিচ্ছিন্ন করে তাতে শ্রমিকের জন্য আনন্দ নেই, আছে শুধু গঞ্জনা, অবহেলা এবং মর্মবেদনা। সুতরাং এথেকে বুঝা যায় সা¤্রাজ্যবাদ এখন আরো নির্লজ্জ হয়ে পড়েছে, কেবল বিশ্বায়নের বানিজ্য ও পুজি লগ্নির ক্ষেত্রে নিজেকে আবদ্ধ রাখছে। জমি দখল করে নিচ্ছে, অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে হানা দিচ্ছে দেশে দেশে। যেমন সাম্পতিককালে রাশিয়া দখল করে নিচ্ছে ইউক্রেনকে পুজিবাদী অর্থনীতির কারনে, চালাচ্ছে জবরদখলদারিত্ব। একক শক্তির দেশ যুক্তরাষ্ট্র আজকের দিনে জার্মানী, ফ্রান্স, ইটালী, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডার মত শক্তিশালী দেশ গুলোর সহযোগিতা নিয়ে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ এবং অত্যাচার চালাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে। তার মধ্যে উল্লেখ করার মত সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক এমনকি হুমকির মুখে রেখেছে ইরানকে, ফিলিস্তিনিকে যেভাবে মন চায় সেভাবে নাচাচ্ছে, ইসরাইল ঐ পরাশক্তির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য নিয়ে। তাদের অত্যাচারে টাল মাতাল আফগানিস্তান ও পাকিস্তান। তারা চাইছে স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচয় মুছে ফেলতে, বিশেষ করে প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে, সুতরাং এর বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমনের জন্য দাড় করানো দরকার জাতীযতাবাদের যাকে আমরা গনতান্ত্রিক বলতে পরি। যে জাতীয়তাবাদ আগ্রাসী নয়, আক্রমনাতœক নয়, নেতি বাচক নয় বা কোন বিশেষ শ্রেণীর নয় বা কোন গোষ্ঠী বা জাতির নয়। এবং যার দৃষ্টি ভঙ্গিতে রয়েছে আন্তর্জাতিকতা, জাতীয়তাবাদ আসলে একটি অনুভূতি বা স্পন্দন যার মধ্যে থাকে দেশ প্রেম, কিন্তু দেশ প্রেম থেকে আবার তা সতন্ত্র ও বটে, ব্যাপক কেননা প্রথমত দেশ প্রেমের তুলনায় জাতীয়তাবাদ অনেক বেশী রাজনৈতিক, দ্বিতীয়ত একটি জাতি কেবল একটি দেশে নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে বসবাস করতে পারে, করেও। বাঙালীরা যেমন আজ করছে। কিন্তু জাতীয়তাবাদ ভিন্ন অর্থে দেশের কথা ভাবে ও না ভেবে পারে ও না। তাতে স্মৃতি থাকে অতীতের, স্বপ্ন থাকে ভবিষ্যতের, স্বপ্ন ও স্মৃতি মিশে একাকার হয়ে যায়। এই স্বপ্নটা খুবই জরুরী, কেন না সমষ্টিগত স্বপ্ন ছাড়া কোন দেশ, বা জাতি বা কোন গোষ্ঠী বাঁচতে পারে না। এমন কি টিকে থাকা ও কঠিন। আমরা জানি সমাজতন্ত্রের সাথে গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের কোন বিরোধ নেই, মৈত্রী রয়েছে, সমাজতন্ত্র দেশে এবং সারা বিশ্বে মানুষের সাথে মানুষের সাম্য গড়ে তুলতে চায়। পুঁজির আন্তর্জাতিকতা করে ঠিক এর উল্টো কাজ, সে সৃষ্টি করে বৈষম্যের লেলিন, কার্লমাকস, মাওসেতুং, ফিদেল কাস্ত্রো, হোচি মিন এরা সবাই সমাজতন্ত্রী ছিলেন কিন্তু সে সাথে জাতীয়তাবাদী ছিলেন না এটাও ঠিক নয়। নিজ নিজ দেশে তারা মুক্তির জন্য লড়াই করছেন, এবং সাথে সাথে সমাজতন্ত্র বিশ্বজুড়ে ব্যপ্ত হোক এটাও তারা চেয়েছেন। এক দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সাথে সারা বিশ্বের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কোন বিরোধ নেই, ঐক্য রয়েছে। লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাতে বিভিন্ন জাতীয় সত্তার নিজস্বতার স্বীকৃতি ছিল। তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল বিছিন্ন হওয়ার অধিকারও। সেই ব্যবস্থার পতনের পর যে জাতীয়তাবাদীদের অভ্যুদয় ঘটেছে তারা কেবল উগ্রই নয়, আধিপত্যবাদী ও যে জন্য রাষ্ট্রের ভিতরে যেমন ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির, শ্রেণীর প্রচন্ড বিরোধ দেখা দিয়েছে, তেমনি বাইরে ও। নব্বই দশকের সমাজ বিশ্বের পতনকে জাতীয়তাবাদী অভ্যুথান করবার কোন কারণ নেই। সেইটি পুজিবাদী অভ্যুথান ঘটে। লেনিন সর্বদাই ছিলেন একাধারে জাতীয়তাবাদী ও হিটলার ও জার্মানীতে তার নিজস্ব ফ্যাসিবাদী তৎপরাতেই লিপ্ত ছিলেন। তাদের জাতীয়তাবাদ ব্যক্তিকে মর্যাদা দেয় না। ব্যক্তিকে রাষ্ট্র ও তথা কথিত জাতির সেবকে পরিণত করে। পুরুষদেরকে বলে একজন স্বামী, পিতা ও সৈনিক হতে; মেয়েদেরকে নির্দেশ দেয় সদগৃহিণী পরিবারের প্রতি নিবেদিত চিত্ত এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অধিক সন্তানের জননী হওয়ার ফ্যাসিবাদীর, উগ্র জাতীয়তাবাদী আর সেই কারণেই তারা সমাজতন্ত্র বিরোধী এবং গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের বিরোধী ও বটে। এই কথা আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি প্রকৃত গণতন্ত্রের সংগে সমাজ তন্ত্রের কোন বিরোধ নেই। সমাজ তন্ত্রেও সকলের অধিকার সমান এবং গণতন্ত্রেও ঐ একই ধ্বনি- সকলের অধিকার সমান। মৌলিক কিছু বিষয়ে সামান্য পার্থক্য রয়েছে বটে। বাঙালরি জাতীয়তাবাদ আক্রমন কারীর নয়। শুধুমাত্র আক্রান্তের অনুভব। এই বোধটা আগে ছিল না। এসেছে ইংরেজ শাসনের পিছু পিছু অনিবার্যরূপে। ওই শাসনে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিকশিত হয়েছিল, যারা শাসক ইংরেজদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের চর্চা দেখেছে। বিজাতীয় শাসকদের হাতে নানা ভাবে লাঞ্চিত ও হয়েছে এবং সে সব ঘটনায় পীড়িত হয়ে আতœ পরিচয় খুঁজেছে। খুজতে গিয়ে জাতীয়বাদী হয়েছে। জাতীয়তাবাদ কেবল যে পরিচয়ের ব্যাপার হয়েছে তা নয়। আতœরক্ষার এবং কখনো প্রতিরোধের অবলম্বনও হয়ে দাড়িয়েছে। ধর্মকে আশ্রয় করার দরুন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ধীরে ধীরে ধর্মীয় পুনরুজ্জীবন বাদের দিকে ঝুকেছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায় ভারতবর্ষ হিন্দু প্রধান কিন্তু সেখানে মুসলমানের সংখ্যা ও নগন্য নয়। এক চতুর্থাংশ বাংলার ক্ষেত্রে হিন্দু মুসলমান প্রায় সমান সমান, মুসলমানের সংখ্যা কিছু বেশী। কিন্তু বাংলায় হিন্দু মধ্যবিত্ত মুসলান মধ্যবিত্তের তুলনায় কমপক্ষে অর্ধশত বছর এগিয়ে ছিল। নবাবী আমলেও হিন্দু মধ্যবিত্তের পক্ষে গড়ে উঠবার প্রস্তুতি দেখা গিয়েছিল। ওদিকে মুসলমানদের অধিকাংশ ছিল কৃষক। তারা ফারসী জানতো না, পরে যে ইংরেজী শিখবে সে সুযোগ ও ছিলনা। ফার্সী জানতো মুসলমান অভিজাতরা, নবাবী শাসনের অবসানে তারা বিপদে পড়লে তাছাড়া এরা বাঙালি ও ছিল না। পরে ক্রমান্বয়ে বাঙালী মুসলমান মধ্যবিত্ত নিজেকে গড়ে তুলেছে। পাট ও অন্যান্য কৃষি পন্য থেকে উদ্বৃত্ত অর্থের সাহায্যে তারা নিজেদের সন্তানদের বিদ্যা শিক্ষা দিয়েছে। শ্রেণী হিসাবে যখন তারা আতœপ্রকাশ করলো, তখন হিন্দু মধ্যবিত্তের সংগে তাদের প্রতিদ্ব›িদ্বতা শুরু হয়ে গেল। ইংরেজরা এই প্রতিদ্ব›িদ্বতাকে উৎসাহিত করেছে হিন্দু মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক আন্দোলন বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে দেখে এমনকি মুসলমান মধ্যবিত্তের প্রতি কিছুটা পক্ষ পাতিত্ব যে দেখায়নি তাও নয়। দুই মধ্যবিত্তের ঝগড়ায় সম্প্রদায় পরিণত হয়েছে জাতিতে। মধ্যবিত্তের মধ্যে হিন্দু পাওয়া গেছে, মুসলমান পাওয়া গেছে কিন্তু কঠিন হয়েছে বাঙালি পাওয়া, বিশেষ করে জাতীয়তাবাদের গঠনে ধর্মের ভূমিকা মুখ্য হবার কথা নয়। একটি জাতির মধ্যে একাধিক ধর্মের মানুষ থাকতে পারে, থাকেও যেমন ধরেন, ইরাকে খ্রিষ্টান আছে, তারা নিজেদের খ্রিষ্টান বলে পরিচয় দেয় না, পরিচয় দেয় ইরাকী বলে। ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রামে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের ভূমিকা অবজ্ঞা করবার মতো নয়। জাতীয়তাবাদের জন্য ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌগলিক ঐক্য অর্থনৈতিক স্বার্থ শক্তিশালী উপাদান হতে পারে, হয় ও। কিন্তু সবচেয়ে উপকারী উপাদান হচ্ছে ভাষা। ভাষা এক হলেই যে জাতীয়তা এক হবে এমন নিশ্চয়তা হয়তো দেওয়া যাবেনা। আরব জাতীয়বাদ বলে একটি অনুভূতি আছে ঠিকই কিন্তু আরবী ভাষীরা কেউ মিশরীয়, কেউবা ইরাকী, আবার কেউবা সৌদি। তবে ভাষার ঐক্য অবশ্যই ধর্মের ঐক্যের তুলনায় অধিক ইহজাগতিক, ধর্ম নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক। বাঙালীর জাতীয়তাবাদ ভাষা ভিত্তিক হবার কথা। কেবল বাংলা বললেই যে বাঙালী হয় তা নয়। সেই সংগে বাঙালীর সঙ্গে সহানুভূতি ভিত্তিক ঐক্যের বোধ থাকা চাই। তবেই একজন বঙ্গভাষীর পক্ষে বাঙালী হওয়া সম্ভব। কিন্তু সকল বাঙালীর ভাষা এক নয়, সকলের মধ্যে ঐক্যের বোধও নেই। অনেক বাঙালী ইংরেজী ব্যবহার করেছে। এখনো করে এবং করতে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়। অপরদিকে আবার অনেক বাঙালী শুদ্ধ বাংলা জানে না। এদের সংখ্যায় বরং অধিক। ভাষার ভিত্তিতে তাই ঐক্য গড়ে ওঠে নি। ঐক্য গড়ে ওঠার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তাও জব্দ হয়েছে ধর্ম তথা সাম্প্রদায়িকতার হাতে। ভাষাতেও হিন্দু মুসলমান ব্যবধান ঢুকেছে। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ওই যে বিরোধ সেটা সামান্য থাকেনি, যদিও প্রথম দিকে তাকে সামান্য বলেই ধারনা করা হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল সাময়িক কারনের প্রবাহে বিলীন হয়ে যাবে। বিভেদের ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতা ও ইন্ধন সরবরাহ করেছে। পূর্ব বঙ্গ কম অনুন্নত পশ্চিম ও উত্তর বঙ্গের তুলনায় জলাভূমি দিয়েই পূর্ববঙ্গ গঠিত। ইংরেজ আমলে বাংলার রাজধানী ছিল কলকাতা, সুতরাং উন্নয়নের ¯্রােত ওই শহর মুখীই ছুটেছে সবেগে। অনুন্নত পূর্ববঙ্গ আরও অনুন্নত হয়েছে। এখানকার অধিবাসীরা বাঙালী নয়, বাঙ্গাল বলে চিহ্নিত হয়ে এসেছে। অনুন্নত পূর্ব বঙ্গে মুসলমানের সংখ্যাধিক্য, আঞ্চলিক বৈষম্য বৃদ্ধির ব্যাপারে এই সত্যটা ও একটা উপাদান হিসাবে কার্যকর ছিল। রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের উথান ও পতন ঘটেছে। কিন্তু তাতে বৈষম্য দূর হয়নি। বাঙালী জাতীয়তাবাদের মূল দূর্বলতা ও প্রধান শত্রæ দুটোই হচ্ছে বৈষম্য। রাষ্ট্রের উথান পতন সেই শত্রæকে স্পষ্ট রুপে চিহ্নিত হতে দেয়নি, বরং তাকে অস্পষ্ট করে দিয়েছে। বিশেষ করে শ্রেণী বৈষম্যকে ইংরেজ শাসনে ভারতবর্ষে একটি রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেটা ভেতর থেকে গড়ে ওঠেনি, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতে জাতি একটি ছিল না, দুটি ও নয়, ছিল অনেক কয়টি। সেই জাতিসত্তা গুলো স্বীকৃতি পায়নি। ভারত একটি দেশ নয়, উপমহাদেশ। পৃথিবীর মানচিত্রে রাশিয়াকে বাদ দিলে ইউরোপের যা আয়তন ভারতের আয়তন তার সমান। সেই বৃহৎ দেশে বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতির বাস, এদের মধ্যে অর্থনৈতিক বিকাশের সমতা আসেনি। ওই অসাম্যের দরুণ ভারত পাকিস্তান ভাগাভাগি হয়েছে এবং পরিশেষে পাকিস্তান ও এক থাকতে পারেনি। এখন বিশাল ভারতে ও টানাপোড়ন ও সংঘর্ষ প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে। এক থাকতে পারবে কি না সন্দেহ আছে। বাংলাদেশে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে কিন্তু আবার হয় ও নি একথা ও বলা যেতে পারে। কারন মধ্যবিত্ত প্রায় উন্মত্ত ইংরেজী শিখতে। কোম্পানীর শাসনামলে যা দেখা যেতো আজও তাই দেখা যাচ্ছে। সর্বত্রই ইংরেজী শিক্ষার উন্মাদনা। বাংলাদেশে অবশ্যই শুরুর স্তর থেকে ইংরেজী পড়ানো হয়। ইংরেজী শেখানোর ব্যাপারে এখানে আগ্রহ প্রকাশ করা হয় বেশী কারন তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশ বাংলাদেশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংগে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এবং বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াকে আরও সামনের দিকে ধাবমান করার জন্য এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশের যোগাযোগ স্থাপন করার জন্য ইংরেজী শেখবার বা শেখানোর বিকল্প নেই। তাই বলে জাতীয় ভাষা আমাদের মাতৃভাষা প্রানের ভাষা বাংলার সাথে প্রতিযোগিতা করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ একটি জাতি রাষ্ট্র নয়, যদিও একটি জাতীয়তা বাদী মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তার প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। বাঙালীদের বাইরে এই রাষ্ট্রে বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি সত্তা রয়েছে। বাংলাদেশী রাষ্ট্র ব্যবস্থা বৈষম্যকে লালন করে এই বৈষম্য যেমন শ্রেণী বিভাজনের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি সত্যের, সে ক্ষুদ্র জাতি সত্তাগুলোর অবস্থানে। তারা যে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ইতিহাসে এই প্রথম বারের মত বাঙালী একটি নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছে। এই রাষ্ট্র সে কেমন ভাবে পরিচালনা করে সেটা ঐতিহাসিক কৌতুহলের বিষয় হবে বৈকি। অর্জিত গৌরব কে সে ধরে রাখতে পারবে কিনা তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে। রাষ্ট্রের ভিতরে বাঙালী যদি আতœ পরিচয় ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে তবে সে অর্জন সামান্য হবেনা, তার তাৎপর্য রাষ্ট্রের সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। এজন্য একান্তভাবে দরকার বৈষম্য দুর করা বাঙালরি জন্য ঐক্যের মূল সূত্র হচ্ছে ভাষা, কিন্তু অদ্যাবধি ভাষা ঐক্য সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রাকৃতিক বৈচিত্র ও বৈষম্য সৃষ্টিতে যে একটা ভূমিকা পালন করেছে সে বিষয়ে বলা হয়েছে। ঐক্যের টানা পোড়েনে জাতীয়তাবাদ নিয়ে যে আলোচনা তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। এক একজনের মতামত এক এক রকম হতে পারে। কিন্তু সকল প্রশ্নের জবাব আসলে খুজে পাওয়া যাবে না একথা অবশ্যই ঠিক। তাই প্রকৃত অর্থে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সকল বৈষম্য দুর করে অর্থনৈতিক, ভাবে সামাজিক ভাবে, রাজনৈতিক ভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সকল বাঙালী জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে বাংলা ভাষার উপর গুরুত্ব দিতে হবে অন্য ভাষার তুলনায়। শুধুমাত্র তখনই সম্ভব হবে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করা।

লেখকঃ জহিরুল ইসলাম শাহীন
সহঃ অধ্যাপক
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ