HEADLINE
ভারত থেকে চিকিৎসা নিয়ে দেশের ফেরার সময় ইমিগ্রেশনে পাসপোর্টযাত্রীর মৃত্যু দেবহাটা প্রেসক্লাবের বার্ষিক সভায় বর্তমান কমিটির মেয়াদ বর্ধিত; সদস্য অন্তর্ভূক্তির লক্ষ্যে উপ-কমিটি ঝাউডাঙ্গায় ৭১ সালের বালিয়াডাঙ্গা যুদ্ধের স্মৃতি চারণে আলোচনা সভা ৪র্থ বার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত কলারোয়ার যুগিখালীর ইউপি সদস্য মফিজুল সাংবাদিক আজিজুল’র মৃত্যুতে সাতক্ষীরা সাংবাদিক সমিতির গভীর শোক সাতক্ষীরায় ধানক্ষেতে ইঁদুর মারা বিদ্যুতের ফাঁদে জড়িয়ে দু’জনের মৃত্যু বাংলাদেশ ভারত এর বন্ধুত্ব বিশ্বে রোল মডেলঃ নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী সাতক্ষীরায় গোপন বৈঠক কালে জামায়াতে ইসলামীর ১০ মহিলা নেতাকর্মী আটক ঐতিহ্যবাহী গুড় পুকুরের মেলা উপলক্ষে মাধবকাটি বলফিল্ড মাঠে উৎসবের আমেজ পরীক্ষার সময় পরিবহন চলা নিয়ে নিশ্চিত নয় জবির পরিবহন পুল
সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:৩২ পূর্বাহ্ন

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে পূর্ব সচেতনতা জরুরী

অজয় কান্তি মন্ডল / ১৫০
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ৬ আগস্ট, ২০২১

বাংলাদেশে সম্প্রতি বন্যা, সাইক্লোন, ভূমিকম্পের পাশাপাশি ‘মহাদুর্যোগ’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে বজ্রপাত। বন্যা এবং সাইক্লোনের মত দুর্যোগের ক্ষেত্রে কিছু পূর্ব প্রস্তুতি নেবার সুযোগ থাকলেও বজ্রপাতের বিষয়টি অনেকটা ভূমিকম্পের মতোই আকস্মিক। গেল ৪ ঠা আগস্ট বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ ইউনিয়নে পদ্মা নদীর পাড়ের একটি ঘাটের পাশের ছোট্ট ছাউনির ঘরে বজ্রপাতে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একরকম বজ্রপাতের থেকে রেহাই পেতে তারা আশ্রয় নিয়েছিল নৌকা থেকে নেমে ওই ঘরটিতে। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় বজ্রপাতে ১৭ জনেরই ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয়। আহত অনেকের অবস্থা ও বেশ আশঙ্কাজনক। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিও রয়েছেন। এমন খবর বেশ হৃদয় বিদারক। বজ্রপাতে এমন অনেক মৃত্যুর ঘটনা আমাদের দেশে অহরহ ঘটে থাকে। সামান্য সচেতনতা এবং কিছু পূর্ব প্রস্তুতি এধরনের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুকে অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সহায়ক। চলুন জেনে নিই বজ্রপাতের সম্পর্কে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্যঃ

প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে বজ্রপাত সকলের কাছে বেশ পরিচিত এবং অতি আতঙ্কের। সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় সমান মাত্রার স্ফুলিঙ্গ আর ভয়াবহ গর্জন নিয়ে আকাশের পুঞ্জীভূত মেঘ থেকে চার্জিত অগ্নি স্ফুলিঙ্গ প্রকৃতির বুকে নেমে আসার নামই বজ্রপাত। বজ্রপাত নিমিষেই শেষ করে দেয় মানুষের জীবন। ছোটকালে অনেকের থেকে শুনেছি মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। কিন্তু বজ্রপাতের সঠিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মেঘে মেঘে ঘর্ষণের থেকেও বেশ ভিন্ন। বজ্রপাতের সম্পূর্ণ বিষয়টি চার্জিত কনার আদান প্রদানে হয়ে থাকে। আমরা জানি জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিনত হয়। বৃষ্টি হয়ে ভূ-পৃষ্ঠে আসার আগে এই মেঘ আরও বেশী ঘনীভূত হয়। এ সময়ে জলীয়বাষ্প কনার ভিতর প্রচুর চার্জিত কনা জমা হয়। মেঘে কিভাবে চার্জ জমা হয় তা নিয়েও গবেষক মহলে বেশ কিছু মতভেদ আছে। সহজ ভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে এমনটি দাঁড়ায়ঃ

ঘনীভূত মেঘের ভিতরের অংশের জলকণা যখন ক্রমশ ঊর্ধ্বাকাশে উঠতে থাকে তখন তারা মেঘের নিচের প্রান্তের দিকের বেশি ঘনীভূত বৃষ্টি বা তুষার কণার সাথে সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়। এ সময়ে প্রবাহিত বাতাসের প্রচন্ড গতির সাথে মেঘের ভিতরের জলকণার সংঘর্ষে প্লাজমা অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্লাজমা অবস্থা হচ্ছে পদার্থের আয়নিত অবস্থা যেখানে মুক্ত ঋণাত্মক (ইলেকট্রন) এবং ধনাত্মক (প্রোটন) আয়নের সংখ্যা প্রায় সমান থাকে। প্লাজমা অবস্থায় উপরের দিকে উঠতে থাকা অবস্থায় চার্জিত জলীয় বাষ্পের কনা বেশ কিছু ইলেকট্রন তথা ঋণাত্মক চার্জ হারিয়ে ধনাত্মক চার্জে চার্জিত হয়। বিপরীত পক্ষে কিছু জলীয়বাষ্প কনা  ইলেকট্রন গ্রহণ করে ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত হয়। জলীয়বাষ্প কনার মাঝে পুঞ্জীভূত এই বিপরীত ধর্মী চার্জের মধ্যে ভরের ভিন্নতার কারনে তারা একই মেঘের ভিতরে পরস্পর বিপরীত প্রান্তে অবস্থান নেয়।

যথেষ্ট পরিমাণ ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ জমা হওয়ার পর এই বিপরীতধর্মী চার্জ পরস্পরকে আকর্ষণ করে এবং তখনই ইলেক্ট্রস্ট্যাটিক ডিসচার্জ তথা তড়িৎ ক্ষরণ বা নিস্তড়িত প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই তড়িৎ ক্ষরণ প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন ভাবে হয়ে থাকে। বেশ কিছু প্রক্রিয়ার মধ্যে সর্বাধিক গৃহীত তিনটি প্রক্রিয়া এখানে তুলে ধরলাম। (১) একই মেঘের মধ্যে পুঞ্জীভূত পরস্পর বিপরীত ধর্মী ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জের মধ্যে আকর্ষণের ফলে একে অপরের সাথে মিলে চার্জ নিরপেক্ষ হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ধরনের বজ্রপাত মেঘের মধ্যেই হয়ে থাকে। (২) একটি মেঘে পুঞ্জীভূত ধনাত্মক বা ঋণাত্মক চার্জের সাথে অন্য একটি মেঘে পুঞ্জীভূত ঋণাত্মক বা ধনাত্মক চার্জের আকর্ষণে চার্জ নিরপেক্ষ হওয়ায় একই ঘটনা ঘটে থাকে। এ ধরনের বজ্রপাত ও মেঘের মধ্যেই হয়ে থাকে। অর্থাৎ এই বজ্রপাতগুলো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছায় না বা ভূপৃষ্ঠের জন্য কোন হুমকি না। আমরা বজ্রপাতের সময় ঘন ঘন যে গর্জন শুনি তার অধিকাংশই উক্ত দুই ধরনের বজ্রপাতের কারনে হয়ে থাকে। (৩) মেঘে পুঞ্জীভূত ধনাত্মক বা ঋণাত্মক চার্জের সাথে ভূমির জমাকৃত চার্জের আকর্ষণের কারনে এই ধরনের বজ্রপাত হয়। মেঘের পুঞ্জীভূত ধনাত্মক বা ঋণাত্মক চার্জের নিরপেক্ষ হওয়ার ঘটনা ও দুইভাবে ঘটে থাকে (ঋণাত্মক ও ধনাত্মক বজ্রপাত)।

(ক) ঋণাত্মক বজ্রপাতঃ মেঘের নিচে বা মাঝামাঝি অংশে পুঞ্জীভূত ঋণাত্মক চার্জ থেকে ইলেক্ট্রন এর প্রবাহ সরাসরি ভূমিতে এসে নিরপেক্ষ হয় যেটাকে বলে নেগেটিভ বজ্রপাত। ভূপৃষ্ঠে আঘাত হানা বেশীরভাগ বজ্রপাত এই ধরনের বজ্রপাত হয়ে থাকে। এ ধরনের বজ্রপাত বৃষ্টি কালীন সময়ে ঘটে থাকে। এই বজ্রপাতের প্রতিটিতে কারেন্ট থাকে ২০-৫০ হাজার অ্যাম্পিয়ার এবং ভোল্টেজ থাকে ৩০ হাজার ভোল্ট থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত। (খ) ধনাত্মক বজ্রপাতঃ মেঘের উপরের অংশে পুঞ্জীভূত বিপুল পরিমান ধনাত্মক চার্জ সরাসরি ভূমিতে এসে ভূমির গভীরে চলে যায়। ভূমির গভীর থেকে ঋণাত্মক চার্জ এর প্রবাহ উল্টো পথে উঠে অর্থ্যাৎ উপরে গিয়ে মেঘের পুঞ্জীভূত ধনাত্মক চার্জকে নিরপেক্ষ করে। এটি বেশ বিপজ্জনক বজ্রপাত এবং এই ধরনের বজ্রপাত কখনো বৃষ্টি চলাকালীন সময়ের মধ্যে হয়না। অর্থাৎ এটিকে বলে বিনা মেঘে বজ্রপাত। এ ধরনের বজ্রপাতে কারেন্ট থাকে প্রায় ৩ লক্ষ অ্যাম্পিয়ার এবং ভোল্টেজ থাকে প্রায় ১০০ কোটি ভোল্ট।

বাতাস বিদ্যুৎ অপরিবাহী কিন্তু মেঘে পুঞ্জীভূত চার্জিত কণা থেকে তৈরি অতি উচ্চ ভোল্টের চার্জ নিস্তড়িত হওয়ার সময়ে বাতাসের একটা সরু চ্যানেলকে আয়নিত করে পরিবাহী পথ তৈরি করে। এ সময় অতি মাত্রায় বাতাসের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং বাতাসের চাপ স্বাভাবিক চাপ থেকে ১০ থেকে ১০০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এ চাপ এবং তাপমাত্রায় উভয়ই বৃদ্ধি পেতে সময় লাগে মাত্র এক সেকেন্ডের কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ। এত কম সময়ে তাপমাত্রা ও চাপের এত ব্যাপক পরিবর্তন চারপাশের বায়ুমণ্ডলকে প্রচণ্ড গতিতে সম্প্রসারিত করে এবং প্রচন্ড শব্দ তরঙ্গ তৈরি করে। আলোর চেয়ে শব্দের গতি বেশ কম হওয়ায় বজ্রপাতের আলোর ঝল্কানির পরেই আমাদের কানে উচ্চশব্দ এসে পৌঁছায়।  

আকাশে ঘটে যাওয়া বজ্রপাতের মোট সংখ্যার খুব কম অংশই ভূপৃষ্ঠে এসে পৌঁছায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলো বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি, তার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ও বেশ হুমকির দিকে। বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান দেশটিতে ব্যাপক হারে বজ্রপাতের অন্যতম কারণ। দেশটির দক্ষিনে বঙ্গোপসাগর আবার এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর আর্দ্র বাতাস দেশটিতে প্রবেশ করে। আবার উত্তরে আছে পাহাড়ি এলাকা এবং কিছু দূরেই আছে হিমালয়। যেখান থেকে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। এই দুইটা বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

বিবিসির এক প্রতিবেদন বলা হয়েছে বাংলাদেশে বজ্রপাতের কারনে ২০২০ সালে ৩৮০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিবিসির ওই প্রতিবেদনে আরও দেখা যায় ২০১৯ সালে ২৩০ জন, ২০১৮ সালে ২৭৭ জন, ২০১৭ সালে ৩০২ জন, ২০১৬ সালে ছিল ৩৫০ জন বজ্রপাতে প্রাণ হারায়। পরিসংখ্যানে সুস্পষ্ট দেখা যায় বিগত বছরগুলোতে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন হয়নি বরং বেড়েই চলেছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা বলা হয় দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর ৭০ শতাংশ ঘটনা ঘটে কৃষিকাজ এবং ১৩ শতাংশ ঘটে নদী বা সমুদ্রে মাছ ধরার সময় সময়।

বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী সেটি নিয়ে বাংলাদেশে বিস্তারিত কোনো গবেষণা নেই। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় এর নানা কারণ উঠে এসেছে। অনেক গবেষকের মতে জলবায়ু পরিবর্তন, গাছ কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ, গাড়ির ধোঁয়া, কলকারখানার ধোঁয়া, যেখানে-সেখানে সারাবছর নির্মাণকাজ চলতে থাকায় অত্যধিক মাত্রায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। সেই তুলনায় গাছ লাগানো হচ্ছে না। মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণে বাতাসে গরম ধূলিকণা বাড়ছে যেগুলো বজ্রপাতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।  

উন্নত দেশগুলোতে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও বাংলাদেশে এ সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোতে যথেষ্ট বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা গ্রহন করায় পরিস্থিত মোকাবেলায় সহায়ক হয়েছে। পক্ষান্তরে আমাদের দেশ থেকে বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে। শহরাঞ্চলে ঘরবাড়ি বেশি হলেও সেখানে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা থাকায় বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা কম। কিন্তু গ্রামে পূর্ব হতেই বজ্র নিরোধক হিসেবে কাজ করত বড় বড় গাছ। দিনকে দিন সেই গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানি বেশি ঘটতে দেখা যাচ্ছে। ফাঁকা মাঠে কৃষিকাজ করতে গিয়ে মৃত্যু হচ্ছে অনেকের। ফাঁকা মাঠে কোনো উঁচু জায়গা না থাকায় মানুষের শরীরে বজ্রপাতের ঘটনা অনেক বেশি হচ্ছে। মেঘে জমাকৃত চার্জিত কনা ভূ-পৃষ্ঠে এসে নিস্তড়িত হওয়ার সময় তারা সবসময় খুঁজতে থাকে স্বল্প দূরত্ব কিভাবে অতিক্রম করা যায়। তাই পরিবাহী উঁচু কোন মাধ্যম পেলেই তার ভিতর দিয়ে মেঘের পুঞ্জীভূত চার্জ ভূ-পৃষ্ঠে এসে নিস্তড়িত হয় তথা চার্জ নিরপেক্ষ হয়। ফাঁকা কৃষি ভূমিতে এবং নদী বা সমুদ্রে এসব পরিবাহী মাধ্যমের অভাব থাকায় মেঘের পুঞ্জীভূত চার্জিত কণা মানব দেহকে একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়। ফলশ্রুতিতে বজ্রপাতে কৃষিকাজে এবং নদী বা সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত মানুষের বেশী প্রাণহানি ঘটে। এই শ্রেণীর মানুষের রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করেই কাজে বের হতে হয়। তাদের নিরাপত্তামূলক তেমন কোন কার্যকর ব্যবস্থা ও নেই। এমনকি বজ্রপাত থেকে রেহাই পেতে সতর্কতা মূলক যেসকল প্রচার সেগুলো ও তাদের কাছে ঠিকমত পৌঁছায় না।

আমাদের দেশে সাধারণত প্রতিবছর এপ্রিল মাস থেকে শুরু করে জুলাই আগস্ট মাস পর্যন্ত বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশী প্রাণহানি ঘটে থাকে। এ সময়ে আকাশে মেঘ দেখলেই ঘরে অবস্থান করাটাই শ্রেয়। এছাড়া বেশ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করে চললে বজ্রপাত থেকে সহজে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। যেমনঃ অতিজরুরি প্রয়োজনে রবারের জুতা পরে বাইরে যাওয়া। উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তার, ধাতব খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা বা মাঠ অথবা উঁচু স্থানে না থাকা এবং নদী, পুকুর, ডোবা বা জলাশয় থেকে দূরে থাকা। বজ্রপাতের আশঙ্কা হলে যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেওয়া। এছাড়াও বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে টিনের চাল যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা। বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভেতর অবস্থান করলে গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ না রাখা। তবে সবচেয়ে ভালো হয় সম্ভব হলে গাড়ি কোথাও পার্ক করে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান নেওয়া। ধানক্ষেতে বা খোলা মাঠে থাকলে তাড়াতাড়ি পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়া। বজ্রপাত চলাকালে বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি ও বারান্দায় না থাকা। জানালা বন্ধ রাখা এবং ঘরের ভিতরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকা। বজ্রপাতের সময় ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার না করে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করা। শিশুদের খোলা মাঠে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখা এবং নিজেরাও বিরত থাকা। সমুদ্র বা নদীতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করা। প্রতিটি ভবনে বজ্রপাত নিরোধক দন্ড স্থাপন নিশ্চিত করা। বজ্রপাতের সময় মোবাইল, কম্পিউটার, টিভি, ফ্রিজসহ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সুইচ বন্ধ রাখা এবং বজ্রপাতের আভাস পেলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা ইত্যাদি।

প্রাকৃতিক কারণে বজ্রপাত হবেই। তবে এতে প্রাণহানি কমানোর সুযোগ আছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনায়নের বিকল্প নেই। একমাত্র অতি বেশী বনায়ন বজ্রপাতের তীব্রতা থেকে রক্ষা করতে পারে। বিষয়টি সকলকে অতি গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। সরকারের যথাযথ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সচেতনতা মূলক সভা সেমিনারের আয়োজন করে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সভা বা সেমিনারগুলো হতে হবে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে। সেখানে সকল শ্রমজীবী, কৃষক, মৎস্যজীবী সহ সকলের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। সেইসাথে উন্নত দেশগুলোর মত কৃষি জমি তথা বেশী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। মুঠোফোন কোম্পানিগুলো তাদের করপোরেট দায়িত্বের অংশ হিসেবে মুঠোফোনের টাওয়ারে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা সংযোজন করে বেশী এলাকা এই বজ্রনিরোধকের আওতায় এনে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর বিষয়টি নিয়ে যথাযথ মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করতে পারে। তবেই প্রতি বছর বেড়ে চলা মৃত্যুর হারকে দমানো সহজ হবে।  

লেখকঃ অজয় কান্তি মন্ডল,

গবেষক,

ফুজিয়ান এগ্রিকালচার এন্ড ফরেস্ট্রি ইউনিভার্সিটি,

ফুজো, ফুজিয়ান, চীন।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ