শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৪:০৩ পূর্বাহ্ন

আইন, ধর্ম ও নৈতিকতার প্রাসঙ্গিকতা

জহিরুল ইসলাম শাহীন / ১৮১
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৭ জুন, ২০২২

আমাদের একটু চিন্তা করা উচিত আইন ধর্ম ও নৈতিকতা সম্পর্কে কিছু বলার আগে এদের কোনটি কার আগেএসেছে। এ কথা আমরা বিনা দ্ব›েদ্ব স্বীকার করতে পারি যে ধর্ম ও নৈতিকতার পরে প্রচলিত হয়েছে আইন। তাহলে এখন চিন্তা করার বিষয় ধর্ম ও নৈতিকতার আগে কার আবির্ভাবগত অবস্থান? সমস্যাটা আসলে বেশ জটিল এবং তর্ক বা আলোচনা যেটাই করি কেন সেটাও বেশ জোরালো। এ আলোচনাটা কিছুটা ‘‘ডিম আগে না মুরগি আগে” তার মত। আলোচনা বা তর্ক যেন শেষ হয়না। ধর্ম নৈতিকতার আগে এসেছে এর পক্ষে যেমন ভূরি-ভূরি যুক্তি বা সমর্থন আছে তেমনি নৈতিকতার আবির্ভাব হয়েছে ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হবার বহু আগে এ মতের সমর্থনও জোরালো। ধর্মের পক্ষে যারা জোরালো সমর্থন দেয়, তাদের মতে সৃষ্টিকর্তা প্রথমে শূন্য থেকে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, পৃথিবীতে তার এবাদাত বা উপাসনার জন্য মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং এই মানুষের মধ্যে তার প্রেরিত পুরুষ কর্তৃক সৃষ্টিকর্তার বানী অর্থাৎ ওহীর মাধ্যমে পাপ পূণ্যের বা কোনটা ভাল বা কোনটা মন্দ তার ধারণা দিয়েছেন। পরবর্তীতে ভাল মন্দ বা পাপ পূণ্যের ধারণা থেকেই ন্যায় অন্যায় ধারণা উদ্ভব হয়েছে। এ মতের মূল কথা হলো সৃষ্টিকর্তা পৃথিবী সৃষ্টি করে কিছ ুনিয়ম মেনে চলার কথা বলেছেন এবং কিছ ুকিছু কাজ থেকে বিরত থাকার কথা বলেছেন। এ যে বিরত থাকতে বলেছেন এবং কিছু নিয়ম পালন বা মেনে চলতে বলেছেন এ থেকেই পরবর্তীতে ভাল মন্দ বা উচিত অনুচিতের উদ্ভব ঘটেছে। অর্থাৎ আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি নৈতিকতার জন্ম হয়েছে ধর্মীয় কিছু ধ্যান ধারণা থেকে। তোমরা এ কাজটা ধর্ম সম্মত বাস্তব সম্মত অর্থাৎ তা ভাল এবং করা উচিত এবং তোমার এ কাজটা করা ধর্মের নিয়ম বিরুদ্ধ তাই এটি খারাপ বা মন্দ এবং তা পরিহার করা উচিত। এ মতের সোজা কথা হলো এ মতের ধর্মীয় বিধি বিধান থেকে যাবতীয় কিছুর উদ্ভব হয়েছে। নৈতিকতার আলাদা কোন স্থান বা অবস্থান নাই বরং তা ধর্মের পূর্বগামী নয়, অনুগামী। নৈতিকতা ও যে ধর্মের পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্বপূণর্ বিষয় সেটা ভুলে গেলে চলবেনা। নৈতিকতা সম্পর্কে সচেতন দৃষ্টি দেওয়া একান্ত প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। জগতে যদি ভাল-মন্দ, উচিত-অনুচিত এর অস্তিত্ব আগে স্বীকার না করা হয় তাহলে সব কিছুই মিথ্যা। মানব সমাজ আগে ভাল-মন্দ, উচিত-অনুচিত শিখেছে এবং পরবর্তীতে ধর্ম এসে তা স্বীকার করে নিয়েছে। পরিবারের, সমাজের প্রচলিত উচিত-অনুচিত কিছ ুধ্যান ধারনা পৃথিবীতে প্রায় সকল ধর্ম বা ধর্ম গোষ্ঠীও সম্প্রদায় মেনে নিয়েছে। কেননা তা ছিল তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সমাজের দাবী। সমাজ বিমুখ কোন ধর্ম পৃথিবীতে দেখা যায় না। সমাজের বেশীর ভাগ মানুষ মনে করেছে যে, চুরি করা ঠিক নয় অনুচিত এবং তা খুবই অন্যায় কাজ, একেবারে নীতি নৈতিকতা বিরোধী। তাই একথা স্বীকার করা উচিত কোনধর্ম চুরি করাকে বৈধ বলে স্বীকার করেনি। অনুরুপভাবে মিথ্যা কথা বলাটা সমাজের চোখে যেমন অপরাধ তেমনি ধর্মের চোখে ও খুবই অপরাধ, কোন ভাবেই পূণ্যের কাজ নয়। অর্থাৎ মোর্দা কথা হলো নৈতিকতার যতটুকু সার্বজনীনতা রয়েছে ধর্মের তা নেই। নৈতিকতার কিছু মানদন্ড সবখানে প্রায় এক হলে ও ধর্মে-ধর্মে প্রভেদ বিস্তর। উদাহরণ স্বরুপ আমরা বলতে পারি এক দেশে এক মাটিতে বাস করে ও মুসলমানদের জন্য কিছু পশু খাদ্য হিসাবে খাওয়া হালাল বা পাপকাজ না হলে ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সেই পশু ভক্ষণ করা মহাপাপের কাজ। কিন্তু সত্য কথা বলা, চুরি না করা, মিথ্যা কথা না বলা, প্রতারণা না করা, ঘৃণা না করা, নীতি নৈতিকতা বিরোধী কোন ঘটনা না ঘটানো ইত্যাদি সকল ধর্মের কাজ এবং উদ্দেশ্য। এখানে এ ব্যাপারে ধর্মের দিক দিয়ে কোন মত পার্থক্য নেই। অর্থাৎ ধর্ম আগমনের বহু পূর্বে নৈতিকতার আবির্ভাব। ভাল মন্দের ধারণা প্রকারস্তরে পাল্টে পাপ-পূণ্যে পর্যবসিত হয়েছে। নৈতিকতা ধর্মের পূর্বগামী। এখন নৈতিকতার মত আইন ও সমাজে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইন ছাড়া সমাজে তো কোন কিছু করা বা চালানো সম্ভব নয়। আইনের সৃষ্টি বা জন্ম বা প্রচলন যেটাই বলিনা কেন, নিঃসন্দেহে ধর্ম ও নৈতিকতার পরে হয়েছে। মানুষ যখন সমাজে বা পরিবারে বা রাষ্ট্রে শৃঃখলাবদ্ধ ভাবে বাস করা শুরু করেছে তখন আইন প্রনয়নের গুরুত্ব পেয়েছে। এবং সাথে সাথে মানুষ যখন রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছে তখনই রাষ্ট্রের অনুগামী হিসাবে আইনের জন্ম লাভ ঘটেছে। মানুষ যখন পরিপূর্ণ সামাজিক ভাবে জীবন যাপন করতে শুরু করেছে এবং সমাজের বেশীর ভাগ মানুষরা শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর মানুষেরা সমাজ বা রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে বিধি বিধান বা নিয়মকানুন সৃষ্টি করেছে তাই আইন। আইন আসলে কোন সমাজ বা নির্দিষ্ট স্থানের নিয়মকানুন বা বিধি-বিধান। স্থানভেদে এর অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। আইন মানুষকেই এ জগতেই শাস্তির ব্যবস্থা করে সমাজ বা রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এক্ষেত্রে এর নীতি হল বল প্রয়োগ। রাষ্ট্র তার কিছু কায়দা কানুন দ্বারা জনসাধারণকে বে-আইনী কাজ থেকে বিরত রাখে সমাজ রাষ্ট্রের কল্যাণে। আইন অমান্য করলে তাকে বিচারের আওতায় এনে বে-আইনী কাজের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে ধর্ম ও নৈতিকতার বিধি বিধান গুলি অমান্য করলে জাগতিক শাস্তির তেমন ব্যবস্থা নেই। বেশীর ভাগ ধর্মে বলা হয়েছে এ জীবন তার পরের জীবনে মানুষের পাপ-পূণ্যের বিচার হবে এবং তা করবেন মহান সৃষ্টিকর্তা। আমাদের জাগতিক পাপ আর পূণ্য মিলে পরকালে আমাদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। কিন্তু নৈতিকতার বিধি বিধান গুলি মেনে না চললে সমাজ বড় জোর মন্দ বা খারাপ বলবে, ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করবে, চারদিকে সমালোচনার ঝড় উঠবে আর পালন করলে সাধূবাদ জানাবে। এখানে ব্যক্তির নৈতিকতা লংঘনের জন্য সামাজিক ভাবে দুরে ঠেলে দেওয়া ছাড়া আইনের মত শাস্তির কোন বিষয় নেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আইনের প্রবল শক্তি আছে জনসাধারনকে বে-আইনী কাজ থেকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে কিন্তু ধর্ম ও নৈতিকতার এরকম তেমন জোর নাই। এখানে বিস্তর স্বাধীনতা আছে ধর্ম ও নৈতিকতা পালন করা বা না করার। সুতরাং মানুষের কল্যানের জন্য যে তিনটি উপাদানের কথা বলা হয়েছে তার কয়েকটিকে গ্রহণ করা ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ বা অপরিহার্য। সুতরাং এ কথা নিঃচিন্তে বলা যায়, রাষ্ট্রের জন্য হোক ধর্ম, আইন ও নৈতিকতা সকল উপাদান বা উৎস সমানভাবে প্রয়োজন। তবে কোনটি প্রয়োজনীয়, আর কেন অবশ্যই পালনীয় আর কোনটিই বা অল্প প্রয়োজনীয় বা পালনীয় তা নির্ধারণ করবে সমাজে এক একজন ব্যক্তি মানুষ। সব বিষয় গুলোই যদি মানুষ সতর্কতার সাথে এবং সততা ও আদর্শের সাথে জীবন গড়ার ক্ষেত্রে মেনে চলতো হয়তো বা ইহলৌকিক বা পরলৌকিক পথ অতিক্রম করার ক্ষেত্রে তেমন কোন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হতোনা। কে শোনে কার কথা যার যার গতিতেই মানুষ চলছে। তবে আইন পালন করা সকল ব্যক্তি মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক সকল গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক রাষ্ট্র। এখানে আইন লংঘনে ব্যক্তি মানুষকে শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়।

লেখকঃ জহিরুল ইসলাম শাহীন
সহঃ অধ্যাপক
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ