HEADLINE
কালিঞ্চী এ. গফ্ফার মাধ্যঃ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন বন্দে আদালতে মামলা বৈকারীতে ১’শ পিস ইয়াবাসহ চোরাকারবারি গ্রেপ্তার রাত পোঁহালেই দেবহাটা প্রেসক্লাবের নির্বাচন সাতক্ষীরায় ছাত্রলীগ নেতাকে অস্ত্রকান্ডে ফাঁসিয়ে ভারতে পালালেন মূলহোতা নির্বাচন নিয়ে ভাবার কিছু নেই, আমরা গণতান্ত্রিক দল : সাতক্ষীরায় আ.ক.ম মোজাম্মেল হক কুলিয়ায় পানিতে ভাসছে কাফনের কাপড় পরিহিত লাশ সাতক্ষীরায় দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা: তদন্ত পিবিআইতে সাতক্ষীরায় খোলপেটুয়া নদীর বেড়ী বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত কলারোয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ২৫ ইভটিজিং প্রতিরোধে আমাদের করণীয়
রবিবার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন

জ্বালানী তেলের হঠাৎ মূল্য বৃদ্ধিতে জনগণ দিশেহারা

জহিরুল ইসলাম শাহীন / ৯৬
প্রকাশের সময় : সোমবার, ২২ আগস্ট, ২০২২

জহিরুল ইসলাম শাহীনঃ একটি দেশকে সমৃদ্ধিশালী করার জন্য যেমন কৃষি পণ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনি জ¦ালানী সামগ্রীও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি যে কোন দেশে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য অর্থাৎ জ্বালানী সামগ্রী। আমদানী নির্ভর এ তরল পদার্থ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি। বর্তমানে মানুষের মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান এবং চিকিৎসা। এবং হঠাৎ করে এসবের সাথে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবা সমুহের সাম্পতিক লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধিতে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে জীবন যাপন করা এখন একেবারে অসম্ভব। এমনকি যারা ভূমিহীন কৃষক, অল্প আয়ের শ্রমিক, ভ্যান চালক, রিকশাচালক, আর বিশেষ করে যারা বেসরকারী স্কুল কলেজে চাকরী করেন তাদের সীমিত আয়ে সংসার চালানো একেবারে অসম্ভব। এমনকি দেখা যায়, এই দ্রব্য বৃদ্ধির সময় কালে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিদেরকেও অটো রিকশা চালাতে, ইজি বাইক চালাতে, এমনকি তরকারী বিক্রি করতে। যার দায় ভার পরোক্ষভাবে জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির ওপর পড়ে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে জনজীবন আজ স্থবির হয়ে পড়েছে। দিন আনে দিন খাওয়ার মতো অবস্থায় দাড়িয়েছে অনেক পরিবারের জন্য। তাই ঐবহৎু ঋধুধষ জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে যথার্থ বলেছেন, ‘ঞযব রহপৎবধংব ড়ভ ঢ়ৎরপব রং ধ ফবংঃৎঁপঃরাব ংরমহ রহ ঃযব পড়হংঃৎঁপঃরাব বপড়হড়সু’’ ১৯৯১ সালে সংঘটিত উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে আজ অবধি এ ধারা বিরাজমান বাংলাদেশে ও তার প্রতিফলন ঘটেছে এবং এর ধারাবাহিকতায় বৃদ্ধি পাচ্ছে জ্বালনী তেলের দাম। তেলের মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ আন্তজার্তিক বাজারের সাথে সমন্বয় সাধন করা। তবে এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়টি হল বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের আয় রোজগার আন্তজার্তিক মানের নয়। তাই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক এ ব্যাপারে ভেবে দেখার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। সর্বশেষ ০৫ আগস্ট ২০২২ জ্বালানী তেলের মূল্য হঠাৎ করে ৪৬% বৃদ্ধি পায়। যা একেবারে মড়ার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো। জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির সাথে সকল পণ্য দ্রব্যের দাম একেবারে লাফাতে লাফাতে বৃদ্ধি পেতে লাগলো যা দেখার মতো বা বাজারে মনিটোরিং করার মতো কেউই নাই। মাসে মাসে কিছু কিছু সাংবাদিক উপজেলা প্রশাসনে দুই একটি ঘর মালিকেররা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তথ্য দেওয়াতে সাথে সাথে শাস্তির ব্যবস্থা করে। অন্য দোকান পাট ঠিকই বহাল তরিয়তে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সম সাময়িককালে জ্বালানী তেলের নতুন মূল্য নির্ধারনের আগে বাংলাদেশে যে পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ৮৪ টাকা ছিল সেটা ১৩০ টাকা এবং ডিজেল লিটার প্রতি ৮০ টাকা ছিল সেটা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে লিটার প্রতি ১১৪ টাকা। রাতারাতি এত মূল্য বৃদ্ধি যা পূর্বে কখন ও ঘটেনি। অথচ বিশ্ব মার্কেটে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়েনি বরং প্রতি লিটারে মূল্য হ্রাস পেয়েছে। গত ১৭/০৮/২০২২ আরও এক ধাপে হ্রাস পেয়েছে তাহলে আমাদের দেশে হঠাৎ করে মূল্য বৃদ্ধি করছে কারা? টক শোতে, বিভিন্ন বক্তার বক্তব্য একেক রকম কেউ বলে জ্বালানী তেলে সরকার  এযাবৎ কাল ভূর্তকি দিতো, আবার কেউ বলছে না জ্বালানী তেলে কোন ভূর্তকি দেওয়া হয় না। অপর দিকে বিসিপি বলছে জ্বালানী তেলের মাধ্যমে বরং সরকার প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা লাভ করছে আসলে কোন টি ঠিক? তৃতীয় বিশ্বের বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে এবং বিশেষ করে ঘন বসতির দেশে হঠাৎ করে সকল দ্রব্যের মূল্য এতটাই বেশী যে সংসার ধর্ম চালানো, বাসা ভাড়া দেওয়া এবং বিভিন্ন শহরে বিশেষ করে রাজধানীতে যারা শ্রমিকের কাজ করে তাদের বেতন তো সামান্য। সেদিন ঢাকা শহরের কয়েকজন শ্রমিক ক্রন্দনরত অবস্থায় বলতেছিল আমাদের যাতায়াত খরচ বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ টাকা, মাসে ৪৫০০ টাকা, বাসা ভাড়া বাদ দিলে আমাদের ডানে থাকে মাত্র ২ থেকে ৩ হাজার টাকার মতো, তাহলে কিভাবে সন্তান দের স্কুলের খরচ যোগাবো এবং তাদের মুখে দুটো ডাল ভাত দিব। এভাবে চলতে পারে না। আপনি একটু ভেবেছেন, যদি কোন তেলের ডিলারের কাছে ১ লাখ লিটার ডিজেল থাকে একে বারে রাতারাতি ৩৪ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকা তার নীট মুনাফা। ১ কেজি আটা হঠাৎ ৪১/৪২ টাকা থেকে ৫০-৫৫ টাকা পর্যন্ত, ডিমের দাম প্রতি খাঁচিতে ৬০-৭০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, চাউল কেজিতে ১০-১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে এভাবে প্রতিটা ক্ষেত্রে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়াতে জীবন যাত্রার মান একেবারে নাভিশ্বাস। দাম বৃদ্ধিতে একটা জিনিস খুবই লক্ষণীয়, ধনীকশ্রেণীর মানুষেরা আরো ধনী, দরিদ্র শ্রেণীর মানুষেরা আর ও দরিদ্র হচ্ছে এবং এক শ্রেণীর মানুষ যারা নি¤œ মধ্যবিত্ত, যারা পরের ক্ষেতে কাজ করতে পারে না, চুরি করতে পারে না, রিকশা চালাতে পারে না, ঘুষ খেতে পারে না, দূর্নীতি করতে পারে না। এদের উপায় আসলে কী হবে? কেউ তো দেখার নেই। যে কৃষক বৃষ্টিতে ভিজে, রোদ্রে পুড়ে, ক্লান্তহীন ভাবে জীবন বাজি রেখে সোনার ফসল ঘরে তোলে তাদের ওপরে ও প্রভাব টা অনেক বেশী পড়েছে। কেননা বাংলাদেশে আমদানিকৃত জ্বালনী তেলের ৭০ ভাগই ডিজেল আর এই ডিজেলের ৭০ ভাগই আবার ব্যবহার হয় কৃষি সংশ্লিষ্ট কাজে। হঠাৎ করে সরকারের জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে প্রতি একর ধান উৎপাদনের খরজ বেড়ে গেছে অনেক বেশী হারে। সবচেয়ে বেশী প্রভাব পড়েছে- সেচের ওপর। এছাড়া সার, কীটনাশকসহ অন্যন্য কৃষি উৎপাদনের পরিবহন খরচ ও বেড়ে যাচ্ছে। যার দরুন গ্রামীন অর্থনীতিতে ও পড়ছে ক্ষতিকর প্রভাব। তাই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি কৃষকদের সঙ্কটে ফেলে দেয় যার প্রভাব আমরা দেখতে পাই বাজারে। শিল্প উৎপাদন যথেষ্ট পরিমান ব্যাহত হয় এবং রপ্তানী বাণিজ্যে নি¤œমুখী প্রভাব পড়ে। তবে বেড়ে যায় উৎপাদন ব্যয়। ফলে আন্তজার্তিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষমতা হ্রাস পায় আমাদের রপ্তানী খাতের যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। আমাদের দেশে বর্তমানে অর্থনীতি কিছুটা শিথিল যার ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় সব দ্রব্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এরকম পরিস্থিতিতে তেলের দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির মধ্যে ফেলেছে। বাড়ি ও বাসা ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক দফা। জীবনযাত্রার এ স্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধিটা সাধারণ মানুষকে অসহায় করে তুলেছে অনেকটা। জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি। বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানী তেল আমদানি করে তাই বিশ্ব বাজারে টিকে থাকার জন্য দেশের অভ্যন্তরীন কাজে ব্যবহৃত জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা জরুরী প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তাছাড়া জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধির আরো একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হল পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে জ্বালানী তেলের দাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশী। কেননা ভারতের মূল্য স্তরের সাথে বাংলাদেশের মূল্যস্তরের সামঞ্জস্য না রাখলে জ্বালানি তেল পাচারের ও ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এ দুটি প্রধান কারণ ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির জন্য অনেকাংশে দায়ী। কিন্তু বর্তমান সময়ে জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির কোন কারণ তো খুজে পাওয়া যায় না। বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্য তো দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। এইতো আবার ২১ শে আগস্ট ২০২২ প্রতি ব্যারেল ডিজেলে ৪ ডলার করে কমেছে। ফেব্রুয়ারি মাসের সম্ভবত ০৮ তারিখে- (২০২২) সম্ভবত ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যখন যুদ্ধ বাধলো তখন অনেক জিনিসের উপর ইউরোপে ও এশিয়ার কিছু কিছু অঞ্চলে প্রভাব ফেলেছে কিন্তু তেলের ওপর তো কোন প্রভাব পড়েনি। এখন এতটা প্রভাব কেন আমার মনে হয় কোন চক্র বা সিন্ডিকেট অর্থাৎ বড় বড় ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে সরকার বা জনগণকে বেকায়দায় ফেলার জন্য একটি প্ল্যান বা পরিকল্পনা সৃষ্টি করেছে যার ফাদে পা রেখে হয়তো বা আমরা চলছি ফলে আমাদেরকে দিশে হারা হয়ে পড়তে হচ্ছে। যে যুক্তি, বুদ্ধি, তৎপরতা বা পরিকল্পনায় থাক না কেন সরকারকে তা কঠোর হস্তে সামাল দিতে হবে। কেননা জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কতিপয় সুযোগ সন্ধানী অসাধূ ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারী আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে উঠে এবং সমাজে নানারকম অবক্ষয়ের সৃষ্টি করে। সর্বোপরি জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সুতরাং আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি জ্বালানি তেল একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোতে খুব বেশী মাত্রায় প্রভাব ফেলে। কেননা, তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। আর এ সব দেশ গুলোর বর্তমান কৃষি ব্যবস্থা অনেকটাই জ্বালানী নির্ভর। যার দরুণ এর প্রভাব পড়ে সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ থেকে উচ্চবৃত্ত সকলের ওপর। তাই সময় এসেছে আমাদের জ্বালানি তেলের বিকল্প কিছু চিন্তা করা এবং গণমানুষের মুখে পুনরায় কিভাবে হাসি ফুটানো যায় সেদিকে নজর দেওয়া। ভাল থাকুন সকলেই।

লেখকঃ জহিরুল ইসলাম শাহীন
সহঃ অধ্যাপক
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ