HEADLINE
সাতক্ষীরার উৎপাদিত টমেটো যাচ্ছে রাজধানী’সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাতক্ষীরা সীমান্তে অপরাধ দমনে বিজিবি ও বিএসএফ এর পতাকা বৈঠক ঝাউডাঙ্গা হাইস্কুল জামে মসজিদের ওযুখানা নির্মাণ কাজ উদ্বোধন শ্যামনগরে বিদ্যুৎস্পর্শে কৃষকের মৃত্যু কাশ্মিরি ও থাইআপেল কুল চাষে সফল সাতক্ষীরার মিলন ঝাউডাঙ্গা সড়কে বাস উল্টে ১০জন আহত ঝাউডাঙ্গায় জমকালো আয়োজনে শুরু হচ্ছে পৌষ সংক্রান্তি মেলা কালিগঞ্জে শীতার্ত মানুষের পাশে ”বিন্দু” মাদ্রাসা শিক্ষক শামসুজ্জামানের বিরুদ্ধে ফের ছাত্র বলাৎকারের অভিযোগ স্বামী বিবেকানন্দ দর্শন আমাদের মুক্তির পথ : সাতক্ষীরায় ১৬০তম জন্মবার্ষিকী উৎসবে আলোচকরা
শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন

ইভটিজিং প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

জহিরুল ইসলাম শাহীন / ১৭৬
প্রকাশের সময় : বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২

জহিরুল ইসলাম শাহীনঃ একজন মানুষ তার জীবনকে যথার্থ সৌন্দর্য মন্ডিত বা সাফল্য মন্ডিত করে তোলে তার নৈতিক মূল্যবোধ। মনুষ্যত্বের সাথে নৈতিকতার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে রয়েছে সাধনা। সে সাধনা হতে হবে মনুষ্যত্ব অর্জন ও নৈতিক মূল্যবোধ অর্জনের সাধনা। সাধনার পেছনে আছে মহৎ গুণাবলী লাভের একান্ত প্রচেষ্টা। উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য চেষ্টার নাম সাধনা। মানুষ যতদিন বিবেকবান হৃদয়ের অধিকারী হয়ে এই নৈতিক আদর্শকে সমুন্নত রাখে ততদিন মনুষ্যত্বের গৌরব প্রকাশিত হয়। কিন্তু আজ সেই নৈতিক মূল্যবোধ মানুষের ভিতরে খুবই কম দেখা যায়। নীতি নৈতিকতার অভাবে আমাদের সমাজ ভয়ানকভাবে সংকটের মুখোমুখি। যে সব সংকট আজ সমাজকে কলুষিত করছে তার মধ্যে ইভটিজিং অন্যতম প্রধান। এটা একটি ভয়াবহ সমস্যা আজ আমাদের দেশে। প্রায় শহর গুলোতে , বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলেজে, স্কুলে, পার্কে সমস্ত জায়গাতে, এমনকি গ্রামের মোড়ে মোড়ে ও এই ইভটিজিং এর ঘটনা বেশী ঘটতে দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরেই এটা সমাজে বিরাজমান। বাংলাদেশের নারী সমাজ প্রায়ই ক্ষেত্রেই ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে থাকে। এ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে বহু লেখা-লেখি হয়েছে কিন্তু কোন ফল পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন মিটিংয়ে, সামাজিক কর্মকান্ডে সভা সমিতিতে জোরালো ভাবে আলোচনা হয়েছে, তাতে ও সমস্যাটাকে নিয়ন্ত্রণে আনা তো দুরের কথা, দিন দিন এর প্রকোপ বাড়ছে। এর পেছনে প্রধান কারণ পেশী শক্তির প্রভাব, অর্থের ব্যাপক প্রভাব এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের ছত্র ছায়ায় থেকে এর প্রসারণ ঘটানো। ইভটিজিং এর অর্থ রাস্তা দিয়ে বা কোনো যানবাহন চলার সময় একজন নারীকে উত্ত্যক্ত করা। সাধারণত মেয়েদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়া কিশোর তরুণদের বিভিন্ন মন্তব্য, শিষ বাজানো, চোখ টিপ্পনী দেওয়া, ওড়নার আঁচল ধরে টান দেওয়া, ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা দেওয়া, বিভিন্ন যানবাহনের ভিতরে বা মার্কেটে ভিড়ের ভিতরে কোনো নারীকে দেখে খোঁচা দেওয়া, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা ইত্যাদি ইভটিজিং। এছাড়া তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে, মোবাইল ফোনে ছবি ওঠানো, বিভিন্ন ছবি নেটে ছেড়ে দেওয়া বা ছবি তুলে বিভিন্নভাবে বিরক্ত করা, মিসকল দেওয়া বা আপত্তিকর ছবি বা মেসেজ পাঠানো ইত্যাদি বেআইনী কাজ গুলো করা ইভটিজিংয়ের সামিল। যখন কোন সমাজ নৈতিক দিক থেকে আদর্শ হারা হয়ে পড়ে, সততা ভুলে যেয়ে অসততার পথ বেছে নেয়, মানবতাকে বিবর্জিত করে অমানবিক ভাবে আগানোর চেষ্টা করে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য সামনের দিকে অগ্রসর হয় তখন সমাজে নানা ধরনের অন্যায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। যারা আজকের আমাদের সমাজে ইভটিজিংয়ের সাথে জড়িয়ে পড়েছে তারা আমাদের সন্তান। তাদের ঘরে মা আছে, বোন আছে, ভাবী আছে, অনেকের স্ত্রী আছে, কন্যা সন্তান ও আছে, ভাবতে হবে আমরা যাদের রাস্তায় উত্ত্যক্ত করছি তারাতো কারোর না কারোর মা, বোন, খালা বা স্ত্রী। তাদের তো নূন্যতম সম্মান আছে, তাদের তো কারোর ঘরের স্ত্রী হতে হবে কোন সময় মা হতে হবে, কারোর না কারোর বোন হবে। কিন্তু সমাজে কেন তারা এত বিবেক বর্জিত কাজের সংগে জড়িয়ে পড়বে। এটা ঠিক নয়। আর এই ধরনের বখাটে নেশাখোর তরুণ যুবকদের দেখা দেখি সাধারণ শিক্ষার্থীরা ও দুষ্টু বন্ধুদের সঙ্গ দোষে শিক্ষা জীবন বাদ দিয়ে, লেখা পড়ায় অমনোযোগী হয়ে ইভটিজিংয়ের মত ঘৃণ্য কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। এছাড়া আজকের সমাজে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিরা ও ইভটিজিংকে বিকৃত আনন্দের বিষয় হিসেবে উপভোগ করছে। সাধারণত স্কুল বা কলেজগামী শিক্ষার্থীরা যাদের বয়স ১৪ থেকে ৩০ এর মধ্যে তারাই বেশী ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে, ফলে উত্ত্যক্ত করার কারণে অনেক মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আবার পিতা মাতা বা অভিভাবকরা তাদের স্কুল কলেজে পাঠাতে সাহস পাচ্ছে না। এটা অবশ্যই অভিভাবকদের কাছে একটা গুরুতর মানষিক অশান্তি। এরকম অশান্তি এখন রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ও ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রতিদিন কত সহজ সরল মেয়েরা এভাবে রাস্তা ঘাটে, বাজারে উত্ত্যক্ত বা ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে তার কোন সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও এটা যে ভয়াবহ রুপে বিস্তার লাভ করছে, তা প্রতিদিন পত্র-পত্রিকা পড়লে বা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের পর্দায় দেখলে তা বোঝা যায়। এর ভয়াবহতা আমাদের চোখে ধরা পড়ে সর্ব প্রথমে চারুকলা ইনস্টিটিউটের মেধাবী ছাত্রী সিমির আত্মহত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে। ২০০১ সালে কিছু উত্ত্যক্তকারী নেশাখোর বখাটে যুবকের লাঞ্চনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নেতিবাচক ও অমানবিক আচরনের শিকার হয় সে। ২০০০ সালে নববর্ষ উপলক্ষ্যে বা মিলিনিয়াম পালন উপলক্ষে ঐতিহাসক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাঞ্চিত হন বাধন নামে একজন ছাত্রী যা সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। শুধু তাই নয় একই ধরনের ঘটনার শিকার হয় মিরপুরের ফাহিমা খাতুন, খুলনার রুমি, গাইবান্ধর স্বপ্না, তৃষা, সাভারের তিথির মতো অসংখ্য তরুণী নিজেদের জীবনের ইতি বা সমাপ্তি টেনেছে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে। ফলে বাংলাদেশের অনেক স্কুল কলেজ গামী মেয়েরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে বদ্ধ ঘরে থেকে জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। সুতরাং এই ধরনের মেয়েরা তাদের প্রাপ্য অধিকার এবং স¦াভাবিক জীবন যাপন ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে। প্রকাশ্যে অপমানিত হয়ে আত্মমর্যাদা হারিয়ে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে সৃষ্ট মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে না ফিরে আসার দেশে চলে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে। ছোট বেলা থেকেই আমদের দেশে মেয়েরা বাবা মায়ের অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণে থেকে বড় হয় এবং অনেক বিধি নিষেধ তাদেরকে মেনে চলতে হয়। এরপর যদি স্কুল কলেজে পাঠানোর পর এমন ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তখন বাবা-মায়ের সামনে আর কোন পথ খোলা থাকে না। বিনা কারণে নির্দোষ মেয়েটার উপর অনেক জ্বালা-যন্ত্রণা, কষ্ট, আঘাত নেমে আসে। তখন দেখার আর কেউ থাকে না। সে হয় সমাজে ঘৃণিত উপেক্ষিত এবং অবহেলিত। অত্যন্ত নিরুপায় হয়ে পড়ে, ভাবুন তো একটা মেয়ের জীবনে এমন করুণ পরিস্থিতি নেমে আসলে তার দ্বায়ভার কার উপর বর্তায়? সুতরাং আমরা একটু ভাবলে বুঝতে পারি এরুপ ঘটনা বা অবস্থা বার বার যদি ঘটে, তার যদি কোন আইনী ব্যবস্থা না থাকে, তখন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন কর্মকান্ডে মেয়েদের সরাসরি অংশগ্রহণ কমে যাবে এবং দেশ তাদের মূল্যবান অবদান থেকে বঞ্চিত হবে। আমাদের মনে রাখা দরকার একটা দেশকে উন্নয়নের শেষ পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে, উন্নত থেকে উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়। নারীরা যদি এই ভাবে বারবার নিগৃহ হয়, প্রকৃত অধিকার যদি না পায়, বাক স্বাধীনতা না থাকে সঠিক বিচার না পায় তা সম্ভব নহে। আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে বলা হয়েছে ২৯৪ এবং ৫০৯ ধারা অনুযায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬ সালের ধারা ৭৬ দন্ডবিধি ৫০৯ ধারা মোতাবেক যদি কেউ কোন নারীর শালীনতা অমর্যাদা করার জন্য কোন মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি বা কোন বস্তু প্রদর্শন করে তাহলে ঐ ব্যক্তি একবছর কারাদন্ড বা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে। এছাড়া ডাক ও টেলি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ এর সংশোধনী আনতে যাচ্ছে। এতে মোবাইল বা অন্য কোন টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি বা বেতার যন্ত্রপাতির সাহায্যে কোন মেয়ের অশ্লীল ছবি, গুরুতর অপমান জনক, অশোভন মন্তব্য, হুমকি, ভীতি, প্রদর্শন করলে অনধিক পাঁচ বছর বা অনধিক পাঁচ কোটি টাকা অর্থদন্ড, অনাদায়ে ৩ মাস কারা দন্ডের বিধান করে আইন সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সের ছেলেদের বা মেয়েদের কাছে কোন মোবাইল ফোনের সিম বিক্রী করা নিষেধ করা হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে ইভটিজিংয়ের জন্য অনেক সময় পিতা মাতাই দায়ি। প্রত্যেকটা পিতা মাতাকে সন্তানের প্রতি অবশ্যই যতœবান হতে হবে, সচেতন হতে হবে। তাদের অবশ্যই জানা উচিত বয়ঃসন্ধিকাল বলে একটা সময় আছে এই সময়ে প্রত্যেকটা ছেলে মেয়ের ভিতর একটা আবেগ কাজ করে। তারা বেশি চঞ্চল অস্থির এবং যে কোন সময় দুষ্টু বালকের সঙ্গে থেকে সে অপরাধ জগতে পা রাখতে পারে। তাই লক্ষ্য রাখা উচিত, সঠিক সময় স্কুল বা কলেজে যাচ্ছে কিনা, ক্লাস করছে কিনা, শিক্ষকদের কাছে একটু খোজ খবর নেওয়া, সন্ধ্যায় ঠিকমত বাসায় ফিরছে কিনা, রাতে বই পড়ছে কিনা, সময় মতো খাচ্ছে কিনা ইত্যাদি বিষয়ে একটু খোজ খবর নিলে হয়তো বা সন্তানেরা এতটা খারাপ হতো না। প্রত্যেকটা মায়ের দায়িত্ব সন্তানদের সঠিক তত্বাবধান করতে পারলে সে সন্তান নষ্ট হতে পারে না। উত্ত্যক্তকারীদের বিরুদ্ধে যদি যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা যায় সঠিক ভাবে আইনের প্রয়োগ করা যায় সরকার এই ব্যাপারে নিরপেক্ষ ভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যথার্থ আইনের প্রয়োগ করলে এবং দেশের সমস্ত জনগণ একত্রে উত্তেজককারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং বিশেষ ভাবে শিক্ষকগণকে এবং সমাজের শিক্ষিত সমাজকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। আজ হোক কাল হোক বাংলাদেশের অলিতে গলিতে উত্ত্যক্তকারীদের খুজে পাওয়া যাবে না। নিঃসন্দেহে প্রত্যেকটা মেয়ে স্বতঃস্ফুর্তভাবে স্কুলে, কলেজে যেতে পারবে এবং বাবা মা নিশ্চিন্তে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া সহ সকল কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারবে। আসুন তাই সবাই মিলে আমরা ইভটিজিং কে না বলি এবং দেশকে উজ্জল করি।

লেখকঃ জহিরুল ইসলাম শাহীন
সহঃ অধ্যাপক
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ