HEADLINE
পরিবারের সবাইকে অজ্ঞান করে ১০ লক্ষ টাকার মালামাল লুট! বাংলাদেশের মেয়েরা এখন আর পিছিয়ে নেই এমপি রুহুল হক ভোমরায় পাসপোর্ট যাত্রীদের তল্লাশির নামে বিজিবির হয়রানি সাতক্ষীরা পৌরমেয়র চিশতিসহ পৌর বিএনপির ১০ নেতা আটক শাশুড়ির কামড়ে জামাইয়ের কান ও জামাইয়ের কামড়ে শাশুড়ির হাতের শিরা বিছিন্ন কালিঞ্চী এ. গফ্ফার মাধ্যঃ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন বন্দে আদালতে মামলা বৈকারীতে ১’শ পিস ইয়াবাসহ চোরাকারবারি গ্রেপ্তার রাত পোঁহালেই দেবহাটা প্রেসক্লাবের নির্বাচন সাতক্ষীরায় ছাত্রলীগ নেতাকে অস্ত্রকান্ডে ফাঁসিয়ে ভারতে পালালেন মূলহোতা নির্বাচন নিয়ে ভাবার কিছু নেই, আমরা গণতান্ত্রিক দল : সাতক্ষীরায় আ.ক.ম মোজাম্মেল হক
বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০৭:১২ পূর্বাহ্ন

চির অম্লান ছেলেবেলার স্মৃতিগুলো

অজয় কান্তি মন্ডল / ৩৩৬
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১ এপ্রিল, ২০২২

প্রতিটি মানুষের জীবনের গল্প বেশ দীর্ঘ হয়। জীবনে চলার পথে প্রতিনিয়ত ঘটমান ঘাত প্রতিঘাতে প্রকাশ পায় শুধুমাত্র ভোগ বিলাসতার জন্যই মানব জীবনের সৃষ্টি হইনি। ছেলেবেলার দুরন্তপনা, স্কুল জীবনের স্মৃতি এবং সেইসাথে শৈশব ও কৈশোরের কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত নিয়ে গল্পে গল্পে আমার ছেলেবেলা।

প্রাকৃতিক ভাবেই শিশুরা জন্মের পর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে তাদের দুরন্তপনা, দুষ্টামি এবং চঞ্চলতা। প্রকৃতির সাথে তাল মেলাতে অন্য সব বাচ্চাদের মত আমিও ছোট থেকে তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। ছিলাম অনেক দুষ্ট আর চঞ্চল প্রকৃতির। সেই চঞ্চলতা এবং দুষ্টামি হার মানাত অনেক কিছুকেই। স্কুল বা পড়ালেখা বাদ দিয়ে অধিকতর পছন্দের জিনিস ছিল বাড়ীর কাজে বাবাকে সাহায্য করা। শুধুমাত্র স্কুল ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বাবাকে বেশি বেশি কাজে সাহায্য করতাম। কেননা, বাড়ীর কাজে বাবাকে সাহায্য করে বাবার মন জয় করতে পারলেই স্কুল বন্ধ দেওয়ার ফলস্বরূপ বাবার হাতের পিটুনি থেকে রেহাই পেতাম।  

ছোট কালে দেখেছি আমাদের অনেক সবজির বাগান ছিল। সেখানে বাবার সাথে দিনরাত কাজ করে চলায় কষ্ট হলেও খুঁজে পেতাম কিছু অজুহাত, স্কুল ফাঁকির অজুহাত। খেতের বীজতলা তৈরি করা, বীজ বপন, পরিচর্যা, সেচ দেওয়া এসব করতে করতে ছোট থাকতেই দুই হাতের তালুতে পড়েছিল অসংখ্য ফোস্কা। লাগাতার কাজ করে চলায় সেগুলো পরবর্তীতে শক্ত হয়ে স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। যেগুলোর উপস্থিতি এখনো হাতের তালুতে খুব সহজেই অনুভূত হয়। খুব ছোট থাকতে দেখেছি আমাদের একটা সেচ দেওয়ার স্যালো মেশিন ছিল। সেটা বাবার সাথে ঘাড় লাগিয়ে এক খেত থেকে অন্য খেতে নিয়ে গেছি। ছোট থাকায় এবং শক্তি কম থাকায় ঠাকুরদাদা ও আমার সাথে ঘাড় লাগানোর চেষ্টা করত। আমাদের চিংড়ী ঘেরেও বাবাকে যথেষ্ট সাহায্য করতাম। পড়ালেখার চেয়েও ওইসব খেত খামারের কাজ আমাকে বেশি আনন্দ দিত সেজন্য সবসময় সেগুলো নিয়েই থাকতাম। পড়ালেখা বা স্কুল যাওয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার জন্য যে সকল পন্থা অবলম্বন করার আছে সেগুলোর সবকয়টি ছিল আমার আয়ত্ত্বে।

প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছে মাসে হয়ত সব মিলিয়ে ২ থেকে ৩ দিন স্কুলে গিয়ে। বাকি দিনগুলোতে নানান অজুহাতে, বাড়ী হতে পালিয়ে, বাবা মায়ের হাতে পিটুনি খেয়ে স্কুল বন্ধ দিয়েছি। একদিন স্কুলে গেলে প্রায় দিন ১৫ তার ধকল সামলাতে সময় যেত। অভিভাবকদের অনেক বকাবকির পরে আবার স্কুলে যেতে রাজি হতাম একটা শর্তে সেটা ছিল বাড়ীর কাউকে সাথে করে নিয়ে গিয়ে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে শিক্ষকদের বলে আসতে হবে গত দিনগুলোতে স্কুল বন্ধ দেওয়ার জন্য যেন শিক্ষকরা আমাকে না মারেন (তখনকার দিনে স্কুলে মারার রীতি ছিল)। স্কুলে সাথে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য বেশীরভাগ সময়ে মা অথবা ঠাকুরাদাদাকে বেছে নিতাম। ওনারা শিক্ষককে বলে আসতেন আমাকে স্কুলে না আসা নিয়ে যেন কিছু না বলেন। এভাবেই মাসের পর মাস চলতে থাকত। তবে বিভিন্ন সাময়িক পরীক্ষা সহ বার্ষিক পরীক্ষা গুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করাতে এবং গতানুগতিক ফল করাতে এক শ্রেণী থেকে পরের শ্রেণীতে প্রমোশন কখনো আটকায়নি।

তখনকার দিনে আমাদের এলাকার স্কুল গুলোতে একটা রীতির প্রচলন ছিল। কোন ছাত্র-ছাত্রী কিছুদিন স্কুলে না আসলে শিক্ষকরা অন্য ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠিয়ে দিতেন তাদের জোর করে স্কুলে উঠিয়ে আনার জন্য। একটু মোটাসোটা আর শক্তিশালী গোছের ছাত্ররাই এ দলে বেশি যোগ দিত। শিক্ষকদের এমন নির্দেশ দেওয়া থাকত, যেখানে যে অবস্থায় তাদের পাওয়া যাবে সেখান থেকে ঘাড়ে করে, জোরপূর্বক, দরকার হলে, বল প্রয়োগ করে একরকম আড়কোলা করে তাদের স্কুলে নিয়ে আসতে হবে। এখনো মনে পড়ে এই দলে শিক্ষকরা বেশি পাঠাতেন সুব্রত দাদা, রঞ্জিত দাদা, মোনো দাদা, তপন মামা সহ আরও অনেককেই। নিজেরা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অন্যদের জোর জবরদস্তি করে স্কুলে নিয়ে আসবে একটু হলেও সুনামের কাজ এটা ভেবে তারাও ওই কাজে বেশ মজা পেত। আমাকে জোরপূর্বক স্কুলে নেওয়ার জন্য প্রায় তারা আমাদের বাড়ী আসত কিন্তু কোনদিন সফল হতে পারিনি। আমি আগে থেকে কোন না কোন ভাবে সংবাদ পেয়ে বাড়ী থেকে পালিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে গা ঢাকা দিতাম। পরে ওদের ব্যর্থ সৈনিকের মত ফিরে যেতে দেখে নিজেকে অনেক বেশি উৎফুল্ল লাগত। কেননা সেক্ষেত্রে জয়ের পাল্লাটা নিজের দিকেই ভারি থাকত।

একদিন দুর্ভাগ্যবশত তাদের হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। সেদিন আমি ওদের আগমনের খবর আগে থেকে জানতে পারিনি। ওরা সেদিন সবাই খুবই তোড়জোড় বেঁধে এসেছিল। হঠাৎ কার থেকে জানতে পেরেছিলাম স্কুল থেকে আমাকে ধরতে আসছে। আমি যেই পালাতে যাব সেই দেখি বাড়ীর চারপাশে দারওয়ানের মত অনেকেই দাঁড়িয়ে গেছে। দৌড়েও পালানোর উপায় না দেখে ফিরে এসে ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিলাম। ওরা সবাই বুঝতে পারল আমাকে তখন ধরা অনেক সহজ হবে। দরজা বারবার খুলতে বলল কিন্তু আমি খুললাম না। ওরা রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে জোর গলায় বলছিল ‘স্যার আজ তোকে মাটিতে যেন পা না পড়ে সেভাবে উঁচু করে ধরে নিয়ে যেতে বলেছে’। আমিও ঘর থেকে প্রতিউত্তরে উচ্চস্বরে বলেছিলাম ‘তোদের কোন স্যার বলেছে সেই স্যারেকে ডেকে নিয়ে আয়। সেই স্যার আসলেও আজ আমাকে স্কুলে নিয়ে যেতে পারবে না’। ওরা সবাই আমাকে অনেক অনুনয় বিনয় করেছিল দরজা খোলার জন্য কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলাম। সেদিন ওরা মোটামুটি ১০-১২ জনের একটা দল এসেছিল। পরে নিজেরা যুক্তি করে কয়েকজন আমাকে পাহারা দিতে লাগল বাকি কয়েকজন স্কুলে চলে গেল স্যারকে জানানোর জন্য। স্কুল কাছাকাছি হওয়ায় অল্প সময়ের ভিতর স্যার এসে হাজির। স্যার বাড়ীর উঠান থেকে আমাকে ঘর থেকে বের হয়ে স্কুলে যেতে বললেন। আমি নীরব থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ, এরপর স্যার বেশ কিছু বকাবকি করে অন্য সবাই কে নিয়ে বিদায় হলেন। আমি দরজা না খুলে সেভাবেই রুমে বসে থাকলাম আর ভাবতে লাগলাম এদেরকে তো বিদায় দিলাম কিন্তু বাবার হাত থেকে আজ আমাকে আজ কেউ রক্ষা করতে পারবেনা।

দুপুরের দিকে বাবা বাড়ী আসলে বড় বোন সকাল থেকে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা বাবাকে পয়েন্ট টু পয়েন্ট বলে দিল। বাবা ঘরের দরজা খুলে বাইরে আসতে বলায় আমি আস্তে করে দরজা খুলে বাইরে বের হলাম। সেদিনের বাবার দেওয়া শাস্তিটার কথা আমার আজও মনে পড়ে। উঠানে প্রখর রৌদ্রের ভিতর দুই হাতে নিজের দুই কান ধরে দুই পা ফাঁকা করে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকা। মেজ কাকা-কাকিমা অনেক ভালোবাসত আমাকে তাই বাবার বেশির ভাগ দেওয়া সাজাগুলোর কিছুটা হলেও ওনাদের জন্য রেহায় পেতাম। সেদিন ও মেজকাকা আমাকে বাবার সাজা থেকে মাপ করে দিলেন, তবে ওনার দেওয়া শর্তে রাজি হওয়ার পরে। শর্ত ছিলঃ আর কোন দিন যেন স্কুল বন্ধ না দিই। পরের দিন থেকে নিয়মিত স্কুল যাব বলে মনে মনে ঠিক করলাম। কিন্তু কেন জানি স্কুল যাওয়ার কথা শুনলে আমার সামনে ঘোর অন্ধকার নেমে আসত। স্বভাব অপরিবর্তনীয় তাই আগের মতই স্কুল না যাওয়ার নানান অজুহাত খুজতাম। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতাম আর সেদিনের অজুহাত খুজতাম। কিভাবে স্কুল না গিয়ে থাকা যায়। যাইহোক অনেক চড়াই উতরাই পার করে এভাবে প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি শেষ করে হাইস্কুলে পদার্পণ করলাম। হাইস্কুলে গিয়েও আমার অবস্থার কোন উন্নতি হলনা। উদ্দেশ্য একটায়, নানান তালবাহনায় স্কুল বন্ধ দেওয়া, এবং যেদিন যেতাম সেদিন গিয়ে সবার পেছনের বেঞ্চে বসতাম।

সাতক্ষীরা জেলার উপকূলবর্তী অঞ্চলে বাড়ী হওয়ায় ১৯৯৫ সালে নদীর বাঁধ ভেঙে আমাদের এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। প্লাবিত হয়েছিল মানুষের বসবাসের জায়গা সহ হাজার হাজার চিংড়ীর ঘের। সেই প্লাবিত এলাকা তিন বছরের ও বেশি সময় পরে সংস্কার হয়। ওই তিন বছরে এলাকার বানভাসি মানুষের দুঃখ দুর্দশার সীমা ছিল না। প্রতিদিন জোয়ার ভাটা ওঠানামা করত বিশেষ করে পূর্ণিমা এবং অমাবস্যা তিথিতে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যেত। সে সময়ে প্রায় প্রতিদিনই বাবার সাথে নৌকা নিয়ে মাছ, কাঁকড়া ধরতে বের হতাম। শখের বশে নয়, জীবিকার তাগিদে। ছোট্ট একটা নৌকা ছিল আমাদের। সেটাকে নিয়ে অনেক ভোর থাকতেই বাবার সাথে বের হতাম। একটা বড় স্টিলের গামলায় আগের রাতে রান্না করা ঠান্ডা ভাত সহ একটা বাটিতে তালের গুড় নিয়ে তার উপরে অন্য একটা স্টিলের থালা উপুড় করে মা সেটাকে গামছা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে আমার মাথায় তুলে দিত। সকাল ৮ টার দিকে আমরা নৌকায় বসে সকালের ভাত খেয়ে আবার আপন কাজে মনোনিবেশ করতাম। বাবা নৌকায় বসে মাছ বা কাঁকড়া ধরার ব্যবস্থা করত আর আমি নৌকা চালানোর কাজে বাবাকে সাহায্য করতাম। ছোট ছিলাম তাই নৌকা চালাতে শরীরের যথাযথ শক্তির সংকুলন হতনা। কিন্তু কোন উপায়ন্তু না থাকায় বাবাকে সাহায্যের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতাম।

সব মিলিয়ে দিনে ৬০-৭০ টাকা আয় হত। কোন কোন দিন সামান্য একটু বেশি। যেটা হত সেটা নিয়েই খুশি থাকতাম। কেননা আমাদের ৪-৫ জনের সংসারে সেই সময়ে ৭ থেকে ১০ টাকা কেজিতে চাল কিনে উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে সবজি মসলা বা অন্যান্য খরচ মেটাতে ওই ৬০-৭০ টাকাই যথেষ্ট ছিল। তখন সবকিছুই নৌকা করে (সবজি, চাল, মুদি দোকান) বাড়ীর খুব কাছাকাছি চলে আসত। যারা একটু গেরস্থ প্রকৃতির মানুষ ছিল তাদের দুঃখ দুর্দশা সেসময়ে অনেক বেশি ছিল। কারণ মান সম্মানের ভয়ে তারা না পারত কাজ করতে, না পারত পতিত জমাজমি থেকে আয় করতে। তখনকার সময়টা স্কুলে না যাওয়ার মজাটা আরও বেশি করে উপভোগ করতাম।

পড়ালেখায় একটু ভালো থাকায় স্কুলের শিক্ষকরা বাবা বা কাকাকে দেখা মাত্রই আমার নামে নালিশ দিতেন। তারা বলতেন ‘ছেলেটার ব্রেন ভালো, একটু স্কুলে পাঠিও, ও স্কুলে আসলে ভালো ফলাফল করতে পারত’। যেদিন শিক্ষকরা বলতেন সেদিন বাবা কাকার কাছে আমার অনেক বকাবকি শুনতে হত। কিন্তু আমি আগের মতই, কারও কাছ থেকে পড়ালেখার বিষয়ে উপদেশ শুনতে একেবারেই ভালো লাগত না। স্কুলে যাওয়ায় আমার বরবরই অনীহা তাই সেখানে যতই লোভনীয় জিনিসই থাকুক না কেন। স্কুলকে আমার কাছে মনে হত জেলখানার বন্দি জীবনের মত।

একদিন স্কুলের টিফিনের পরে সাধারণ বিজ্ঞান ক্লাসে ম্যাডাম ঢুকলেন। ম্যাডামের প্রথম অনুসন্ধান ছিল গতকাল কারা স্কুলে আসেনি সেটা তদারকি করা। স্কুল বন্ধ দেওয়ার কারনে সেদিন ম্যাডাম ডান হাতের তালুতে ব্লাক বোর্ড পরিস্কারের জন্য ব্যবহৃত ডাস্টারের কাঠের পাশ দিয়ে সজরে আঘাত করেছিলেন। সেই হাতের ব্যাথাটা অনেকদিন ছিল বিশেষ করে খেতে গিয়ে ব্যথাটা বেশি অনুভূত হত। কয়েকদিন ধরে হাতের ওই ব্যাথাটার জন্য অনেক বেশি রাগ হত এবং নিজেকে বেশ অপমানিত বোধ করতাম। তখন থেকেই বুঝতে চেষ্টা করলাম, সত্যিই তো আমাকে সবাই এই স্কুল বন্ধ দেওয়া নিয়ে এত বেশি বকাবকি করে দেখিই তো একবার নিজ থেকে চেষ্টা করে স্কুল বন্ধ না দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে। ওই ঘটনার পরে নিজে নিজেই কঠিন একটা প্রতিজ্ঞা করলাম আর কখনো স্কুল বন্ধ দেব না তাই সেটা যে পরিস্থিতিতেই হোক না কেন এবং সবসময় সামনের বেঞ্চে বসার চেষ্টা করব। হাইস্কুল জীবনের পাওয়া গুলোর ভিতর সবথেকে বড় পাওয়া ছিল আমার স্কুলে যাওয়া নিয়মিত করন।

যতদূর মনে পড়ে ওইদিনের পর থেকে আর কোনদিন স্কুল বা কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও গুরুতর অসুস্থ ছাড়া ক্লাস বন্ধ দেইনি। তার ফল ও আমি হাতেনাতে পেয়েছিলাম। সেবার যখন নবম শ্রেণীতে উঠলাম একটু ভালো ফলাফল করায় তখন সব শিক্ষকরা মিলে আমাকে জোর করিয়ে বিজ্ঞান বিভাগে ক্লাস করতে বলেছিলেন। তার পরেও ফলাফলের দিক দিয়ে বিজ্ঞান বিভাগের সকল ছাত্র-ছাত্রীর ভিতর আমি ছিলাম সবার শেষে। তবে তার পর থেকে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া এবং পড়ালেখায় মনোনিবেশ করায় দশম শ্রেণীতে সবাইকে টপকে উচ্চ নম্বর পেয়ে নতুন ক্লাস শুরুর পাশাপাশি মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্কুল থেকে সর্বোচ্চ GPA নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। বিগত বছরগুলোতে স্কুল ফাঁকি আর পড়ালেখায় চরম অনিয়মের কারণে প্রাথমিকে এবং অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সৌভাগ্য আমার হইনি।

মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে আমরা ছিলাম লেটার গ্রেডিং (GPA) পদ্ধতির প্রথম ব্যাচ। আমাদের সময়ে এ+ বা এ গ্রেড পাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা খুবই কম ছিল। ২০০১ সালের মাধ্যমিকের ফল যেদিন বের হয়েছিল সেদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাধাপদ বিশ্বাস মহাশয়ের কাছে গিয়েছিলাম ফলাফল জানতে। স্যারের বাড়ী ওইদিনই আমার প্রথম যাওয়া। স্যার পাকা শান বাঁধানো পুকুরের সিঁড়িতে বসিয়ে আমাকে পুরো স্কুলের রেজাল্ট শিট দেখিয়েছিলেন। স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহন করা সব ছাত্রছাত্রীর রোল নাম্বার সেখানে দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বেশীরভাগ রোল নাম্বারের পাশে তৃতীয় বন্ধনীর ভিতরে বড় হাতের এফ (F) লেখা ছিল। আর হাতে গোনা খুব কম সংখ্যকের রোল নাম্বারের পাশে GPA উল্লেখ করা। গ্রেডিং পদ্ধতি নতুন চালু হওয়ায় অন্য অনেক শিক্ষকের মত প্রধান শিক্ষক ও সেদিন আমার রোল নাম্বারের পাশে তৃতীয় বন্ধনির মধ্যে উল্লেখ করা ৪.৩৮ এই GPA এর অর্থ আমাকে বোঝাতে সক্ষম হননি। পরে বাড়ী ফিরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (BTV) রাত আটটার খবরের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম মাধ্যমিকে নতুন লেটার গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হওয়ায় বিগত বছর গুলোর তুলনায় সে বছর ফলাফল বিপর্যয়ের ভিতর দিয়ে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে ৭২ জন সহ সারাদেশে মোট ৭৬ জন GPA ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। নিজের GPA ৫ এর কাছাকাছি হওয়ায় মনেমনে এটায় ভেবে শান্তি পেয়েছিলাম যে আমারটাও তাহলে খুব খারাপ না।

লেখকঃ অজয় কান্তি মন্ডল

গবেষক,

ফুজিয়ান এগ্রিকালচার এন্ড ফরেস্ট্রি ইউনিভার্সিটি, ফুজো, ফুজিয়ান, চীন।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ