খুলনায় অনলাইন শিক্ষার সুবিধায় উচ্চবিত্তরা, হতাশ নিন্ম বিত্তরা

খুলনায় অনলাইন শিক্ষার সুবিধায় উচ্চবিত্তরা, হতাশ নিন্ম বিত্তরা

মেহেদী হাসান, খুলনা থেকেঃ করোনা শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের জীবনধারা বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। রেহাই নেই সর্বস্তরের শিক্ষারও। লকডাউন বা গৃহবন্দিদশার ৫০ দিনে রাজ্যে শিক্ষার পরিস্থিতি একেবারে ওলটপালট হয়ে গিয়েছে বলে মনে করছে শিক্ষা শিবির। করোনা ভাইরাসের মহামারীতে চলমান অনলাইন ক্লাসের সুবিধা পাচ্ছে স্মার্ট ফোনধারী উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা। বঞ্চিত এবং ক্লাসের সুবিধা না পাওয়ার হতাশায় ভুগছেন নিম্নবিত্ত কিংবা দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারের শিক্ষার্থীরা। এন্ড্রয়েট ফোন না থাকলে তারা এই সুবিধা পাবেন না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের জন্য বাসায় বাসায় হ্যান্ড নোট দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
খুলনা মহানগরীর রায়পাড়া এলাকার শিক্ষার্থীর অভিভাবক জাকিয়া সুলতানা বলেন, অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালানোই কষ্টকর। সন্তানদের এমনি সময়ে কোচিংয়ে দেওয়ার মতো টাকা থাকে না। আর অনলাইনে ক্লাসতো দূরের কথা। যারা ধনী তারা ওইসব ক্লাস করুক।
মহানগরীতে সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত সিটি গালর্স স্কুলের তৃতীয় শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় দেড়শ’। তার মধ্যে এন্ড্রয়েট ফোনের মাধ্যমে ক্লাসের সুবিধা পাওয়ার সামর্থ্য রয়েছে ২৫ জনের মতো। এ হিসেবে ১৭ দশমিক ৩৬ জনের স্মার্ট ফোন রয়েছে। আর ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থীই স্মার্ট ফোন সেবার বাইরে রয়েছেন। এ চিত্র প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়েই। এ অবস্থায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বঞ্চিত হচ্ছে জেলা প্রশাসনের চালু হওয়া অনলাইন ক্লাসের সুবিধা থেকে।
জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এর শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষক-শিক্ষিকাকেও সংসদ টেলিভিশনে প্রচারিত সব ক্লাস দেখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ি অধিদপ্তরের আওতাধীন সব আঞ্চলিক কার্যালয়, জেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা/থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধকালীন ষষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণির পাঠদানের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য ‘সংসদে বাংলাদেশ টেলিভিশন’-এ নির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক পাঠদান কর্মসূচি চলমান। চলমান রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রমও সংসদ টেলিভিশনে। সংসদ টেলিভিশনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে খুলনায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাসের জন্য ফেসবুক ও ইউটিউবে নেওয়া হচ্ছে ক্লাস। জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের যৌথ উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল প্রাইমারি এডুকেশন খুলনা ও ডিজিটাল সেকেন্ডারি এডুকেশন খুলনা নামে ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল এর মাধ্যমে চলমান এই কার্যক্রম।
খুলনা মহানগরীতে সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত সিটি গালর্স স্কুলসহ অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইতি, চৈতি ও আনজুরা, আদিত, চয়ন, দেবাশীষসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীরা জানান, তারা অনলাইন ক্লাসের কোন সুবিধা পাচ্ছেন না। সংসদ টিভি দেখারই সুযোগ নাই সেখানে এন্ড্রফোন কেনার সামর্থ্য কোথায় পাবে তাদের পরিবার।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত খুলনা সিটি গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্কুল এ্যাম্বাসেডর শাহ মো. জিয়াউর রহমান স্বাধীন বলেন, এ ধরণের উদ্যোগ নেওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। তা না হলে দারিদ্রসীমার নিচের শিক্ষার্থীরা এ ধরনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। সবার জন্য শিক্ষা এই স্লোগান নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম সিরাজুদ্দোহা বলেন, যে সকল শিক্ষার্থীদের এন্ড্রয়েট ফোন নেই তারা এই ক্লাসের সুবিধা পাবে না। আর সবাইকে নিয়ে এই চিন্তাও করা হয়নি।
খুলনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা খোন্দকার রুহুল আমিন বলেন, যে সকল শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা ইন্টারনেট ব্যবহার করবে এবং এন্ড্রয়েট মোবাইল ফোন থাকবে তারা এই ক্লাসের সুবিধা পাবে। অন্যরা পাবে না।
খুলনা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান বলেন, এখন প্রতিটি পরিবারেই এন্ড্রয়েট ফোন আছে। পরিবারের কারও না কারও এই ফোন আছে। আর একেবারে যাদের নেই তাদের বাসায় বাসায় এই ক্লাসের হ্যান্ডনোট দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
খুলনার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন নেই, কিছু শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন থাকলেও অর্থাভাবে ইন্টারনেট সেবা নেই এবং স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেবা থাকা সামান্য কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে এ অনলাইন শিক্ষা আগ্রহ সৃস্টি করতে পারছে না। ক্লাসে আই কন্ট্রাক্টে শিক্ষার্থীকে আগ্রহী করা হয়। কিন্তু এ গতনুগতিক অনলাইন শিক্ষায় আগ্রহ তৈরী হচ্ছে না। এর ফলে অনলাইন শিক্ষার সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই অনলাইন ক্লাসে সাফল্য পাচ্ছে না। সেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সফল হওয়া দুস্কর।
খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষা চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন, সকলের কাছে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা নেই ঠিক। কিন্তু সংসদ টিভি যতলোক দেখে তার চেয়ে বেশি লোকের হাতে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা আছে। তাই সংসদ টিভির চেয়ে ফেসবুক ও ইউটিউবে অনলাইন শিক্ষা বেশি সফল হবে বলে তিনি আশা করেন।

এই সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

%d bloggers like this: