পবিত্র মাহে রমজানে দান সদকা করার গুরুত্ব ও পদ্ধতি

পবিত্র মাহে রমজানে দান সদকা করার গুরুত্ব ও পদ্ধতি

অধ্যাপক এম.এ. মালেক শেখ : পবিত্র রমজান মাস গোটা মানব জাতির হেদায়েতের জন্য মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাযিলের মাস। আল-কুরআন থেকে হেদায়েত পেতে হলে তাকওয়া অর্জন প্রয়োজন। কুরআনের ভ‚মিকায় মহান আল্লাহ সুবহানুতা’লা কারা পবিত্র কুরআন থেকে হেদায়েত লাভ করতে পারবে এর ভ‚মিকায় উল্লেখ করেন –

(১) মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এমন একটি গ্রন্থ যাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এটা মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েত নামা। আর মুত্তাকি হলো তারাই যারা গায়েবের উপর দৃঢ় বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি উহা থেকে ব্যয় করে। (সূরা বাকারা-২ ও ৩ নং আয়াত)।
(২) নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে আর নামাজের পাবন্ধী করেছে এবং যাকাত আদায় করেছে তাদের জন্য তাদের রবের পক্ষ থেকে উত্তম পুরুষ্কার রয়েছে আর আখিরাতে তাদের কোন ভয় এবং দুশ্চিন্তাও থাকবে না। (সূরা বাকারা- ১৭৭ নং আয়াত)।
(৩) তোমরা (ঈমানদারগণ) ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না, তোমরা তোমাদের প্রিয়বস্তু ব্যয় করবে। (সূরা আল ইমরান-৯২ নং আয়াত)।
(৪) নিশ্চয় মহান আল্লাহ সুবহানুতা’লা সদকার জন্য মনোনীত করেছেন- (১) ফকির (২) মিসকিন (৩) সদকা আদায়কারী সংস্থার কর্মচারীবৃন্দ (৪) মনজয় করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিবর্গ (৫) গোলাম আযাদ করতে (৬) ঋণ গ্রস্থদের ঋণ পরিশোধে (৭) জিহাদে অংশ গ্রহণকারীদের প্রয়োজন পূরণে এবং (৮) নিঃস্ব মুসাফিরদের প্রয়োজন পূরনে। এটা আল্লাহ নির্ধারিত ফরজ আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞবান। (সূরা তওবা- ৬০ নং আয়াত)।
(৫) দান সদকার উপর প্রকৃত হকদার সেই সমস্ত অভাবীরাই যারা দ্বীনের কাজে আল্লাহর পথে আবদ্ধ। তারা কারও কাছে হাত না পাতার দরুন, তাদের চেহারায় অভাব ও অনাহার ক্লিষ্টতার ছাপ বিদ্যমান। তারা মানুষদেরকে জড়াইয়া ধরিয়া দান প্রার্থনা করে না। আর যে সম্পদ তোমরা তাদের সাহায্যে দান করবে, আল্লাহ তার উত্তম সওয়াব দান করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বাজ্ঞানী। (সূরা বাকারা – ২৭৩ নং আয়াত)।
রাসূল (সা:) এরশাদ করেন যে, রমজানের দান সদকা, রোজার ত্রæটি বিচ্যুতির কাফফারা স্বরুপ এবং সওয়াব ৭০ গুন বেশি।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সদকায়ে ওয়াজিবাহ (যাকাত ও ফিতরা) রমজান মাসেই আদায়করা সর্বোত্তম। মিসকিনরাই দান সদকা পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার এবং দান সদকা ইসলামী সরকারের মাধ্যমে অথবা ইসলামের প্রতিনিধিত্বকারী কোন সংস্থার মাধ্যমে আদায় করা উত্তম। যাতে দাতার মধ্যে গর্ব ও গ্রহীতার হীনমন্যতার সৃষ্টি না হয়।
ফকির ঃ ফকিরকে আমরা সবাই চিনি। যারা প্রয়োজন অপ্রয়োজনে, সময়-অসময়ে মানুষের কাছে হাত পাতে।
মিসকিন ঃ যাদের জীবন নির্বাহের উপযোগী সহায় সম্পদ তেমন কিছুই নাই। কিন্তু কারোর কাছে হাত পাতে না। সীমাহীন অভাব অনাটনের কথা কাউকে জানতেও দেয় না। কুরআন ও সুন্নায় আল্লাহ ও তার রাসূল (সা:) তাদেরকে খুজে বের করে, তাদের বাড়িতে দান সদকার উল্লেখযোগ্য অংশ পৌছে দেওয়ার জন্য জোর তাগিদ দিয়েছেন। যাতে তারাও ভালোভাবে রমজানের সিয়াম পালন, ঈদের খুশি উপভোগ করতে এবং সমাজে সু-প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
এমন লোকদের সংখ্যা বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে অনেক। কিন্তু তাদেরকে খুজে বের করা বেশ কঠিন। সেই কঠিন কাজটি পালন করার জন্য তৌফিক দান করায় আল্লাহ শুকরিয়া। আপনাদের সদয় বিবেচনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কয়েকটি মিসকিন পরিবারের করুন অবস্থা আপনাদের সামনে পেশ করছি ঃ

(১) তিন কন্যা সহ স্বামী ও স্ত্রীর সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের ভ্যান চালকের পরিবার। ভ্যান চালক হওয়া সত্তে¡ও খেয়ে না খেয়ে তিন মেয়ের পড়াশোনার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। বড় মেয়ে এস.এস.সি, এইচ.এস.সি. বাংলায় অনার্স সহ মাস্টার্স সবকয়টিতে প্রথম বিভাগ পেয়ে উত্তীর্ণ। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় টাকা পয়সার অভাবে বেকার ও নিঃসঙ্গ দুর্বিসহ জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। মেঝো মেয়ে এইচ.এস.সি পড়াকালিন সময়ে এক যৌতুক লোভী পরিবারের লোলুপ দৃষ্টিতে পড়ে ছেলের ভ‚য়া শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পল্লী বিদ্যুৎ-তে উচ্চ বেতনে চাকুরী ও যৌতুকের না দাবির প্রলোভনে পড়ে পড়াশুনা ছেড়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বিবাহের কিছু দিনের মধ্যেই স্বামীর বাড়ীর লোকেরা (স্বামীর মা ও বোনরা) যৌতুকের জন্য নির্যাতন শুরু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে পারিবারিক শালিসী বৈঠক, পরবর্তীতে ইউনিয়ন পরিষদ বৈঠকে ও ব্র্যাকের যৌতুক বিরোধী বিচারের মাধ্যমে সমস্যার কোন সমাধান হয়নি। ইতিমধ্যে দুটি বাচ্চাও হয়েছে। দুই বাচ্চা সহ মেয়েটি এখন বাপের বাড়িতেই অবস্থান করছে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মানসিক দুঃচিন্তা ও টাকার অভাবে এ্যাপেনটি সাইটের চিকিৎস্যা না করতে পারায় নাড়ি ফেটে যায়। স্থানীয় সদয় ব্যক্তিদের সহযোগিতায় অপারেশন করে পঙ্গু অবস্থায় বেঁচে আছে। ছোট মেয়ের পড়া শুনা বন্ধ হয়ে যাওয়ারউপক্রম বাড়ির গৃহিনী স্বামী ও মেয়েদের এই দুরাবস্থায় সেও হতাসাগ্রস্থ।
(২) তাবলীগের মুবাল্লিগ ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ঃ ১৯১৫ সালে ভোলাতে এক তাবলীগ জামায়াতের সফরে কাকরাইলের এক জন মুবাল্লিগের সাথে পরিচয় হয়। পরিচয়ে জানা যায় যে, তিনি ১০ বছর তাবলীগের বড়হুজুরসহ দেশি বিদেশী মেহমানদেরকে খেদমত করেছেন। তার খেদমতে সন্তষ্ট হয়ে বড় হুজুর তার পুতœীকে তার সাথে বিবাহ দিয়েছেন। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে হাফেজে কুরআন, ঢাকা লালবাগ মাদ্রাসার ছাত্র। মেঝো মেয়ে ২৫ পারা কুরআনের হাফিজা। ছোট ছেলে ১৫ পারা হিফজ শেষ হয়েছিল। তিনি একটা হাউজিং কোম্পানির ডাইরেক্টরও ছিলেন। যেখান থেকে কাকরাইলের বিদেশী মেহমানদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত ১০টি গাড়ির সমুদয় খরচ বহন করা হতো। অতিব পরিতাপের বিষয় বড় হুজুরের মৃত্যু ও হাউজিং কোম্পানি মালিকের মৃত্যু হওয়ায় কোম্পানির কর্মচারীদের সীমাহীন লুন্ঠনে কর্মচারীরা মালিক বনে যায়। আর যেহেতু তিনি মালিকপক্ষে ছিলেন সেহেতু তার চাকুরী চলে যায়। চাকুরী চলে যেয়ে দুর্বিসহ জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা ও ভরন পোষনে তিনি অক্ষম। তাই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
(৩) অবসর প্রাপ্ত হিফজ ও নূরানী কুরআন শিক্ষক পরিবার ঃ আমি আমার বিশ্বস্থ একজন আলেমের মাধ্যমে জানতে পারলাম যে, ৩৫-৩৬ বছর হিফজ খানা ও আলিয়া মাদ্রাসায় নূরানী বিভাগে চাকুরী থেকে গত ডিসেম্বর অবসর নেওয়া একজন শিক্ষকের করুন অবস্থা। বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর সুবিধা না থাকার কারণে এমনটি হয়েছে। আয়ের তার বিকল্প কোন ব্যবস্থা নেই। এমনকি রমজান মাসে রোজা রাখার জন্য যতটুকু খানার প্রয়োজন ততটুকুও সংগ্রহ করার সংগতি তার নেই।

অধ্যাপক এম.এ. মালেক শেখ
বিভাগীয় প্রধান
কৃষিশিক্ষা বিভাগ
পাটকেলঘাটা এইচ আর কলেজ।

বিস্তারিত জানতে ও সহযোগিতা পাঠাতে ঃ মোবাইল ব্যাংকিং রকেট নং: ০১৭২০-৫২৯২৯১

এই সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

%d bloggers like this: