ছোট্ট একটি পরিবারের এ গল্প – এলিন সাঈদ-উর রহমান

ছোট্ট একটি পরিবারের এ গল্প – এলিন সাঈদ-উর রহমান

জগদীশ সিংহ ও সুলেখা সিংহ আর তাদের একমাত্র সন্তান তনয় সিংহ। ছোট্ট পরিবারের একমাত্র ছেলেটির স্বপ্ন; সেও বড় হয়ে একদিন বাবার মতো কৃষক হবে। সোনার মাটি চাষ করে ফলাবে সোনালী ফসল। যে ফসল দেখে মায়ের মুখে ফুটবে হাসি। আনন্দ অশ্রুতে ভিজবে দুঃখী বাবার চোখ।

জীবনের শুরুতেই সীমাহীন দরিদ্রতার কষাঘাতে আর বিভিন্ন অসঙ্গতির সঙ্গে নিত্য সংগ্রাম যেন নিত্য নিয়তি মেধাবী দরিদ্র ছাত্র তনয় সিংহের। বহু প্রতিকুলতার সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম করেও জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হয়েছে সব সময়। তার গ্রামের নাম সারসা। সাতক্ষীরার তালা থানার ধানদিয়া ইউনিয়নের এই প্রত্যন্ত গ্রামে পড়াশোনা করা তো দূরে থাক, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ধকল সামলাতেই সারা বছর ব্যস্ত থাকেন এখানকার খেটে খাওয়া মানুষ। মধুকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতি বিজড়িত কাব্যময় কপোতাক্ষ নদের পাশেই এ গ্রামের অবস্থান। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় এ গ্রামের মানুষকে বন্যার সাথে যুদ্ধ করতে হয়। বাড়িঘর ফসলের জমি তলিয়ে থাকে বন্যার করাল গ্রাসে। এসব ধকল সামলিয়ে পড়াশোনার সুযোগ কই?

কিন্তু থেমে থাকেনি তনয়ের আত্নপ্রত্যয়। কৃষক বাবার দরিদ্রতা আর বন্যা,ঝড়, সিডর, আইলা,আম্পান প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রতিকূলতা কোনকিছুই হার মানাতে পারেনি তনয়ের দৃঢ় সংকল্প।চেষ্টা করে গেছেন নিরন্তর। সারসা তথা ধানদিয়া ইউনিয়নে ভালো স্কুল না থাকায় ভর্তি হন কপোতাক্ষ নদ পাড়ি দিয়ে কেশবপুরের সাগরদাঁড়ি এম এম ইনস্টিটিউশনে। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করে এইচএসসি ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী কেশবপুর কলেজে। এরপর পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন আর জেনেটিক্স এন্ড প্লান্ট ব্রিডিং এ এমএস সম্পন্ন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

সেদিনের সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ অনেক বড়। কৃষক বাবা ও গৃহিণী মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। সেই হাসি ছড়িয়ে গেছে সারা গ্রামের মানুষের মুখ থেকে মুখে। তবে সে হাসি কৃষক হয়ে নয়, কৃষিতে বিসিএস ক্যাডার হয়ে।

৩৮ তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। তার এই সফলতার পেছনে রয়েছে অক্লান্ত পরিশ্রম, নিরলস প্রচেষ্টা ও বিরামহীন অধ্যবসায়। প্রাকৃতিক ও আর্থিক সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে প্রচণ্ড আস্থা আর বড় হবার অদম্য আকাঙ্ক্ষাই আজ তাকে এনে দিয়েছে সাফল্য।

মেধাবী তনয়ের জীবনের প্রতি পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে শ্বাসরুদ্ধকর গল্পের একেকটি অধ্যায়। যেখানে আছে আশা, আছে হতাশা আর কান্না ভুলে ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য সাফল্যগাঁথা। সাতক্ষীরার তালা থানার প্রত্যন্ত সারসা গ্রামে বেড়ে ওঠা তনয় ছোট থেকেই বাবার সঙ্গে মাঝে মাঝে মাঠে কাজ করতেন। তবে কেউ তখনো আঁচ করতে পারেনি কী অদম্য মেধা নিয়ে বেড়ে উঠছেন তিনি। একান্ত সাক্ষতকারে তনয় বলেন, শত কষ্টের মাঝেও নিভে যাননি তিনি। মনের ইচ্ছাটাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সব সময়। ৩৮ বিসিএস কৃষি ক্যাডারের চাকুরিতে যোগদানের পর তিনি তার মেধা ও মননের বিকাশ ঘটাবেন। কৃষি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইচ্ছা তার আছে। তিনি তার ভবিষ্যৎ জীবন ও পরিবারের জন্য সকলের নিকট দোয়া প্রার্থী।


এলিন সাঈদ-উর রহমান

সহকারী তথ্য অফিসার,

জেলা তথ্য অফিস, যশোর

এই সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

%d bloggers like this: