দেবহাটার চাঞ্চল্যকর মনিরুল হত্যা: ছিনতাইকৃত ইজিবাইকের অংশ উদ্ধার, নলতার রমজান আটক

দেবহাটার চাঞ্চল্যকর মনিরুল হত্যা: ছিনতাইকৃত ইজিবাইকের অংশ উদ্ধার, নলতার রমজান আটক

মাহমুদুল হাসান শাওন: সাতক্ষীরার দেবহাটায় চাঞ্চল্যকর ইজিবাইক চালক মনিরুল হত্যার ঘটনায় জড়িত তার স্ত্রী রাবেয়া খাতুন ও প্রেমিক সাইদুর রহমান রাজু’র আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলোক জবানবন্দী দেয়ার এক সপ্তাহ পর পর কিলিং মিশনে অংশ নেয়া রমজান আলী (৩৫) নামের অপর এক আসামীকে গ্রেপ্তার ও মনিরুলের ছিনতাইকৃত ইজিবাইকের বিভিন্ন অংশ একটি পুকুর থেকে উদ্ধার করেছে দেবহাটা থানা পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃত রমজান আলী কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা সোনাটিকারী গ্রামের মৃত শহর আলীর ছেলে। শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ মোস্তাফিজুর রহমান, দেবহাটা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার শেখ ইয়াছিন আলী ও দেবহাটা থানার ওসি বিপ্লব কুমার সাহার দিকনির্দেশনায় চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) উজ্জ্বল কুমার মৈত্রসহ সঙ্গীয় পুলিশ সদস্যরা গাজীরহাট বাজার এলাকা থেকে রমজান আলীকে গ্রেপ্তার করেন।
গ্রেপ্তার পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে রমজান আলীর দেয়া স্বীকারোক্তিমুলোক তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলার কামটা গ্রামের সনৎ সেনগুপ্তের ছেলে কৌশিক সেনগুপ্তের পুকুর এবং পাশ্ববর্তী হাসড়াখোলা নামক একটি সমাধিস্থল থেকে ইজিবাইক চালক মনিরুলকে হত্যার পর ছিনতাইকৃত ইজিবাইকটির বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করে পুলিশ।
উল্লেখ্য, সাংসারিক বিরোধ ও স্ত্রী রাবেয়া খাতুনেরর পরকীয়ার জের ধরে গত বৃহষ্পতিবার (২৫ জুন) রাতে ভাড়াটিয়া সেজে থানায় যাওয়ার কথা বলে ইজিবাইক চালক শিমুলিয়া গ্রামের ইসমাঈল গাজীর ছেলে মনিরুলকে ডেকে নিয়ে গলায় প্লাস্টিকের রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর তার লাশটি সখিপুর টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসের সামনে একটি সবজি ক্ষেতে ফেলে দিয়ে মনিরুলের ব্যবহৃত ইজিবাইকটি নিয়ে পালিয়ে যায় হত্যাকারীরা। পরদিন শুক্রবার ( ২৬ জুন) ভোরে সখিপুরের ওই সবজি ক্ষেত থেকে মনিরুলের লাশ উদ্ধার করে দেবহাটা থানা পুলিশ। এঘটনায় নিহত মনিরুলের ভাই বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় একটি হত্যা মামলা (নং- ০৯, তারিখ-২৬/০৬/২০২০, ধারা-৩০২/৩৯৪/৩৪ পেনাল কোড) দায়ের করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দেবহাটা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) উজ্জ্বল কুমার মৈত্র জানান, হত্যাকান্ডের পর থেকে হত্যার মোটিভ উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে তৎপর হয়ে ওঠে পুলিশ। একপর্যায়ে গ্রেপ্তার করা হয় মনিরুলের স্ত্রী রাবেয়া খাতুন ও তার প্রেমিক কামটা গ্রামের ওহাব সরদারের ছেলে মুরগি ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে মনিরুলকে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকারসহ গত বৃহষ্পতিবার (২ জুলাই) সাতক্ষীরা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট বিলাস মন্ডলের কাছে নিহত ইজিবাইক চালক মনিরুলের স্ত্রী রাবেয়া খাতুন ও রাবেয়ার প্রেমিক সাইদুর রহমান রাজু পৃথক পৃথকভাবে ১৬৪ ধারায় তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেন।
আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীতে সেসময়ে তারা জানায়, মনিরুলের বন্ধু রাজু তাদের বাড়িতে আসা যাওয়ার সূত্র ধরে স্ত্রী রাবেয়ার সাথে অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হলে রাজু রাবেয়াকে বিয়ে করার কথা বলে। কিন্তু রাবেয়া তার স্বামী থাকতে তার সাথে বিয়ে করা সম্ভব নয় বলে জানায়।
গত ২৫ জুন ভোরে সাংসারিক বিরোধে মনিরুল রাবেয়াকে মারপিট করে। এরপর সকাল ১০ টার দিকে রাবেয়া গাজীরহাট বাজারে যেয়ে রাজুর কাছে নিজের স্বামী মনিরুলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে। এতে রাজু প্রচন্ড রেগে গিয়ে ঐদিনই মনিরুলকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) উজ্জ্বল কুমার মৈত্র আরো জানান, সাইদুর রহমান রাজু জবানবন্দীতে বলেছিলো যে, রমজান নামে একজনকে সাথে নিয়ে সে দেবহাটাতে আসে। রমজান মনিরুলের ইজিবাইকে যায়, আর রাজু মোটর সাইকেলে করে দেবহাটায় যেয়ে বৌদির দোকানের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। মনিরুলকে হত্যার জন্য আগে থেকে রাজু রশি কিনে কাছে রেখে দেয়। পরে তারা এক হয়ে মনিরুলের ইজিবাইকে সখিপুরের দিকে আসার সময় সখিপুরের চাতালের কাছে এসে পিছন দিক থেকে মনিরুলের গলায় রশি ফাঁস দিয়ে ২ জনে মিলে জোরে টান দেয়। এতে মনিরুলের হাত পা নিথর হয়ে পড়লে তার লাশটি সবজি ক্ষেতে ফেলে দিয়ে তারা ইজিবাইক নিয়ে পালিয়ে যায়। যেহেতু রাবেয়ার প্রেমিক রাজুর জবানবন্দীতে রমজান আলীর নাম বারবার উঠে এসেছিলো, সেহেতু ঘটনার মুল মোটিভ উদঘাটনের জন্য শুক্রবার তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তার স্বীকারোক্তি মোতাবেক মনিরুলের ইজিবাইকের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করা হয়। তিনি আরো জানান, মামলার তদন্ত এখনো চলমান। শনিবার রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে রমজান আলীকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হবে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে দেবহাটা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বিপ্লব কুমার সাহা বলেন, চাঞ্চল্যকর ইজিবাইক চালক মনিরুল হত্যাকান্ডের পর থেকে ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তৎপর হয় দেবহাটা থানা পুলিশ। একের পর এক অভিযান পরিচালনা করে প্রথমে মনিরুলের স্ত্রী রাবেয়া খাতুন ও তার প্রেমিক সাইদুর রহমান রাজুকে গ্রেপ্তার এবং পরবর্তীতে তাদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক রমজান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়ে। সর্বশেষ রমজান আলীর স্বীকারোক্তিতে অভযান চালিয়ে হত্যাকান্ডের শিকার মনিরুলের ইজিবাইকের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।

এই সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

%d bloggers like this: