স্বাধীনতা তুমি মুক্ত করো আমায়

স্বাধীনতা তুমি মুক্ত করো আমায়

স্বাধীনতা তুমি
পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল। 
স্বাধীনতা তুমি
ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।
স্বাধীনতা তুমি
মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিল পেশী। 
কবি শামসুর রহমান তার কবিতার মধ্যমে স্বাধীনতার অভিব্যক্তি এভাবেই প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আমরা কি সত্যিই স্বাধীনতার এমন স্বাদ উপলব্ধি করতে পেরেছি, বঙ্গবন্ধুর গড়া সোনার বাংলায় আমরাকি আজ সত্যিই স্বাধীন? স্বাধীনতাকে আমি ভাগ করেছি চার ভাগে যথা- বাক স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। 

প্রথমে আসি বাক স্বাধীনতায়, বাক স্বাধীনতা বলতে আমরা বুঝি মনের ভাব প্রকাশ করে কথা বলার স্বাধীনতাকে। কিন্তু আজ আমরা এই স্বাধীনতা থেকে পরাধীন। আমাদের দেশে আজ আমরা আমাদের মনের ভাব ব্যক্ত করতে পারিনা, আমাদেরকে কথা বলতে হলে কিছু বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হয়। যেমন- যদি কেও আমার সাথে অন্যায় করে, আমাকে লাঞ্ছিত করে, আমি যদি তার প্রতিবাদ করতে চায় তাহলে আমাকে ভাবতে হয় সে আমার থেকে ক্ষমতাশালী কিনা। যদি সে আমার থেকে ক্ষমতাশালী হয়ে থাকে তাহলে আমি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারবোনা। আর যদি কেও সাহস করে প্রতিবাদ করতে যায় তাহলে তাকে দিতে হয় চরম মাশুল। আমাদের বাক স্বাধীনতা নেই বলেই আজ আমাদের মা-বোনেরা ধর্ষিত লাঞ্ছিত হচ্ছে। এখানে আমাদের বাক স্বাধীনতা পরাধীন। কিন্তু বাক স্বাধীনতা একটি স্বাধীন দেশের সকল নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। যদি কনো দেশ প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই প্রত্যেক নাগরিকের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত। 
এলেনর রুজভেল্ট এবং মানবাধিকার সনদ (১৯৪৯) এর ১৯ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী- “প্রত্যেকের অধিকার আছে নিজের মতামত এবং অভিব্যক্তি প্রকাশ করার। এই অধিকারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নিজের স্বাধীনচেতায় কোনো বাধা ব্যতীত অটল থাকা, পুরো বিশ্বের যে কোনো মাধ্যম থেকে যে কোনো তথ্য অর্জন করা বা অন্য কোথাও সে তথ্য বা চিন্তা জ্ঞাপন করার অধিকার”।
তাই কনো ব্যক্তির বাক স্বাধীনতা প্রতিহত করা রাষ্ট্রের স্বাধীনতাকে বিরোধিতা করে। 
তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যায় যেমন- মর্যাদাহানি, কুৎসা রটানো, পর্নোগ্রাফি, অশ্লীলতা, আক্রমণাত্মক শব্দ এবং মেধাসম্পদ, বাণিজ্যিক গোপনীয়তা এবং জননিরাপত্তা। এক্ষেত্রে বাকস্বাধীনতা যদি অন্য কারও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে বা কারও অপকার করে তবে অপকার নীতির মাধ্যমে বাকস্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করা যেতে পারে। এ বিষয়ে স্টুয়ার্ট মিল তার ‘অন লিবার্টি  ” নামক গ্রন্থে বলেন, ‘একটি সভ্য সমাজে কোন ব্যক্তির ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তার উপর তখনই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার করা যায়, যখন তা অন্য কোন ব্যক্তির উপর সংঘটিত অপকারকে বাঁধা দেয়ার জন্য করা হয়।”
তবে এক ধরনের আমলাতন্ত্র সাধারণ মানুষের বাক স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে রেখেছে। এই প্রতিবন্ধকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের মানুষিকতার পরিবর্তন করতে হবে। এককতন্ত্র ভাবে কনো দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে দেশের উন্নয়ন সাধিত হয়। তাই একটি স্বাধীন দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার জন্য সব থেকে বেশি প্রয়োজন জনসাধারণের বাক স্বাধীনতা। 

এখন আসা যাক কর্মের স্বাধীনতায়, কর্মের স্বাধীনতা বলতে বুঝায় কর্মের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এখানে আমাদের কর্মের স্বাধীনতা নেই, আমরা আজ কর্মের সম অধিকার পায়না। সকল কর্মক্ষেত্রে এলিট শ্রেণী প্রভাব বিস্তার করে বসে আছে। এখানে রয়েছে সজন প্রীতি, রয়েছে দূর্ণীতির অবাধ চলাচল, তাই যোগ্যতা এখানে অসহায়। আজ আমরা একটি স্বাধীন দেশে বসবাস করেও যদি এমন কর্ম বৈষম্যর শিকার হই তাহলে দেশ স্বাধীন করে কি লাভ হলো। যখোন আমরা পরাধীন ছিলাম তখনও আমরা এমন বৈষম্যের শিকার হয়েছিলাম, তখন পশ্চিম পাকিস্তানীদের সকল কর্মক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো আর আমরা ছিলাম কোনঠাসা।  আজও তার অভিপ্রায় ঘটছে, ক্ষমতাশালীরা সকল কর্মে সুযোগ পায় আর সাধারণ মানুষেরা হয় বঞ্চিত। এখানে আবার ইচ্ছেমত করা হয় কর্মী ছাটায়, দিনমজুরেরা পায়না নায্য মজুরি, কৃষকেরা পায়না ফসলের সঠিক মূল্য, এখানে আমাদের কর্ম স্বাধীনতা পরাধীন। একটি স্বাধীন দেশের সকল নাগরিকের কর্মের স্বাধীনতা থাকা বাধ্যতামূলক, তাহলে এখানে আমাদের স্বাধীনতা কোথায়?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ‘এই স্বাধীনতা তখনি আমার কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে, যেদিন বাংলার কৃষক-মজুর ও দুঃখী মানুষের দুঃখের অবসান হবে।” তাই আমাদের কর্মের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তাহলে আমরা প্রকৃত স্বাধীন দেশে পরিণত হতে পারবো।

এবার আসি রাজনৈতিক স্বাধীনতায়, রাজনৈতিক বিষয়াদিতে অংশগ্রহণের অধিকারকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলে। নিজের পছন্দ অনুসারে ভোট দেওয়ার, নির্বাচিত হওয়ার, মতামত প্রকাশ, প্রতিবাদ এবং সরকারের সমালোচনা করার স্বাধীনতাই হলো রাজনৈতিক স্বাধীনতা। রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অধ্যাপক লাস্কির মতে, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে সক্রিয় হওয়ার ক্ষমতাকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলে।” কিন্তু আমারাকি এই স্বাধীনতা উপলব্ধি করতে পারছি, এখানেও আমরা পরাধীন। আমরা আজ রাষ্ট্রের সকল ব্যাপারে সক্রিয় হওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছি, একটি স্বাধীন দেশে এটা কনোভাবেই কাম্য নয়। একটি দেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে রাজনৈতিক স্বাধীনতার কনো বিকল্প নেই। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সক্রিয়তা নির্ভর করে তার রাজনৈতিক স্বাধীনচেতার উপর। তাই আমাদেরকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হতে হলে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে হবে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা বজায় হলে তবেই রাষ্ট্রে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হবে। এজন্য আমাদের সঠিক এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। অধ্যাপক লাস্কি রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য যথোপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ও খোলাখুলি সংবাদ সংগ্রের কথা বলেছেন।

সর্বশেষে আসি অর্থনৈতিক স্বাধীনতায়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলতে অধ্যাপক লাস্কি অভাব ও বেকারত্ব থেকে মুক্তির কথা বলেছেন। বস্তুত অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসগৃহ ও চিকিৎসার সুযোগকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলে। এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট বলেন, ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ অভাব থেকে মুক্তি।” কিন্তু আমাদের মুক্তি কোথায়, এখানেও সাধারণ মানুষ পরাধীন। সরকারের দেওয়া আর্থিক সহায়তা দীর্ঘদিন যাবত কিছু মানুষরূপী রাক্ষস আত্মসাৎ করে যাচ্ছে, প্রায়ই শোনা যায় চাউল চোরের খবর। বস্ত্রের অভাব আমাদের দেশে নেই বললেই চলে তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যপক দুর্ণীতি ও অনিয়ম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভূমিহীন ও অসহায় মানুষেদের ঘর উপহার দিচ্ছে, সেখানেও কিছু ঘৃণপাপী এর অর্থ আত্মসাৎ করছে, আবার কিছু কিছু এলাকায় ঘুষের মাধ্যমে দেওয়া হয় এ ঘর, ঘরের কাজে ব্যবহার করা হয় নিন্ম মানের উপকরণ, এমন খবর গণমাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত দেখে থাকি। চিকিৎসা ক্ষেত্রও এর ব্যাতিক্রম নয়, এখানেও দূর্ণীতি আর অনিয়ম বাসাবেঁধে আছে। এইতো কিছুদিন আগেও আমরা গণমাধ্যমে দেখলাম এক নবজাতক শিশুর বাবা অনেকগুলো হাসপাতাল ঘুরেও তার শিশুর চিকিৎসা পায়নি শেষ পর্যন্ত শিশুটির মৃত্যু হয়। দেশে অধিক সংখ্যাক সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতাল থাকলেও নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, আবার সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে গেলেও নানা ভোগান্তীর শিকার হতে হয়। এসকল অর্থনৈতিক পরাধীনতা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হলে সকল অর্থনৈতিক সহিংসতা থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে, তাহলেই জাতি মুক্তি লাভ করবে। 
স্বাধীন দেশে বসবাস করেও যদি আমারা পরাধীন হয়ে থাকি তাহলে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত ও ২ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত বাংলার স্বাধীনতা গুমরে কেঁদে মরবে। তাই স্বাধীনতার কাছে আর্তনাদ স্বাধীনতা তুমি মুক্ত করো আমায়, সকল পরাধীনতা থেকে মুক্ত হোক সবাই।

লেখকঃ মাসুদ রানা মিঠু

Print Friendly, PDF & Email
এই সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন