সাতক্ষীরা সদরের ঐতিহ্যবাহী ইউনিয়ন ঝাউডাঙ্গা

সাতক্ষীরা সদরের ঐতিহ্যবাহী ইউনিয়ন ঝাউডাঙ্গা

সাতক্ষীরা জেলার সদর উপজেলার ১১নং ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়ন এ মুহুর্তে একটি ঐতিহ্যবাহী ইউনিয়ন একথা ঠিক কারণ এই ইউনিয়নটির মাঝখান দিয়ে হাইওয়ে রোড যার মাধ্যমে ঝাউডাঙ্গা বাজারের উপর দিয়ে বাংলাদেশের সমস্ত জেলা গুলিতে অতি সহজেই যাতায়াত করা যায়। ঝাউডাঙ্গা বাজারের পশ্চিম দিকে ভারত সীমান্ত ঘেষে ভাদিয়ালী পর্যন্ত পূর্বদিকে পাটকেলাঘাটা বাজার দক্ষিন দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা ও জেলা শহর এবং একেবারে নিকটে কলারোয়া পৌরসভা এবং উপজেলা অবস্থিত সুতরাং জেলা শহর থেকে শুরু করে কলারোয়া উপজেলা এবং পশ্চিম ও পূর্বে সমস্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সুন্দর। ঝাউডাঙ্গা বাজারটি সাতক্ষীরা সদর উপজেলা যত গুলি বড় বাজার রয়েছে তার মধ্যে ব্যবসা ও বাণিজ্যের দিক দিয়ে অন্যতম প্রধান বাজার। এই বাজারে ব্যবসা ও বাণিজ্যের দিক থেকে অনেক অংশে এগিয়ে রয়েছে। আমরা দেখেছি সেই ষাট দশক থেকে শুরু করে আজ অবধি কাপড়ের পাইকারী ও খুচরা ব্যবসা। সুদুর যশোর জেলা থেকে শুরু করে খুলনার পাইকগাছা কপিলমনি দেবহাটা তালা পাটকেলাঘাটা থেকে ও ব্যবসায়ীরা আসে ঝাউডাঙ্গা বাজারে মোকাম করতে। এছাড়া উক্ত বাজারে বেশ কিছু অটো রাইচ মিল রয়েছে যার মাধ্যমে বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চল থেকে শুরু করে পূর্ব এবং দক্ষিণ অঞ্চল পর্যন্ত আতপ ও সিদ্ধ চাল এবং ধান সরবরাহ করা হয়। বাজারের চারপাশ জুড়ে রয়েছে উন্নত মানের চাষের বেশ কিছু বড় বড় মাছের ঘের যেখানে উৎপাদন করা হয় কাতলা, মৃগেল, রুই, সিলভার কাপ, মিনার কাপ, পাঙ্গাঁস, ভেটকি, চিতল, বাগদা, গলদা, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ যাহা প্রতি দিনই রাজধানী শহরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় রপ্তানী করা হয়। এই বাজারটি আম, কাঁঠাল, সুপারী, পান, নারিকেল, জাম ও হলুদ ব্যবসার জন্য ও প্রসিদ্ধ। ১১নং ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নটি শিক্ষা দিক্ষার ক্ষেত্রে ও জেলার যে কোন ইউনিয়নের চাইতে এগিয়ে আছে বলে আমি মনে করি। এই ইউনিয়নে ৪টি উচ্চ বিদ্যালয় যার মধ্যে একটি বালিকা বিদ্যালয়, প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ১২টি এবং ৩টি মাদ্রাসা রয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি প্রি-ক্যাডেট স্কুল ও আছে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলি ও ঝাউডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের রেজাল্ট প্রত্যেক বারই নজর কাড়ার মত। প্রতি বছর এই ইউনিয়ন থেকে এম.বি.বি.এস করছে, ইনঞ্জিয়ারিং কোর্সসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাচ্যের অক্সফোর্ট খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর অসংখ্যা শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করার সুযোগ পেয়ে থাকে। এই ইউনিয়নে দুইটি মহা বিদ্যালয় রয়েছে এবং কারিগরি শিক্ষা লাভ করার জন্য ও অনেক গুলি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখান থেকে প্রতিবার শিক্ষার্থীরা ভাল ফলাফল লাভ করছে। সাতক্ষীরা জেলাতে যতগুলি ডিগ্রী বা অনার্স অধিভুক্ত কলেজ রয়েছে তার মধ্যে আমাদের ঝাউডাঙ্গা কলেজ অন্যতম প্রধান। এই কলেজে অন্যতম প্রধান। এই কলেজে প্রায় ২০০০ (দুই হাজার) ছেলে মেয়ে পড়াশুনা করে । প্রত্যেক বারই এইচ.এস.সি সহ সম্মান শ্রেণিতে ভাল ফলাফল করে থাকে। এই কলেজটিতে ৯টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু আছে। আর ও কয়েকটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালুর জন্য এবং ৩টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালুর জন্য প্রস্তাবনা রয়েছে। প্রত্যেকটি বিষয়ে অতি দক্ষতার সাথে শিক্ষকরা পাঠদান করে থাকেন। এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার জন্য বাইরে খুব একটা যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। এই ইউনিয়ন থেকে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষিত ব্যক্তিরা বাংলাদেশের সচিবলায় থেকে শুরু করে সরকারের অনেক উচ্চ পদস্থ প্রতিষ্ঠানে চাকরীরত আছেন। ইউনিয়নের এম.বি.বি.এস ডাক্তার, ইনঞ্জিনিয়ার, কলেজ শিক্ষক হাইস্কুল শিক্ষক এবং বিশেষ করে মাস্টার্স ডিগ্রীধারী মানুষের সংখ্য এতই বেশী যে অন্যান্য ইউনিয়নে সেটা দুষ্প্রাপ্য বলে আমি মনে করি। এই ইউনিয়নে সোনালী ব্যাংক, রুপালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংক, এশিয়া ব্যাংক, গ্রামীন ব্যাংক, ব্রাক, আশা, জাগরনী, সুশীলন এনজিও সহ অনেক গুলি বেসরকারী অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান পড়ে উঠেছে। ইউনিয়নটি ঐতিহ্যবাহী হবার পিছনে আরেকটি কারণ আছে। সাতক্ষীরা জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিস ঝাউডাঙ্গা বাজারের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। বাজারের সঠিক উন্নয়ন সামাজিক অবকাঠামো আর্থিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক অবস্থান ইতিবাচক এবং মানুষের ভিতরে রয়েছে বেশ মিল। ইউনিয়নের জনগণ অত্যন্ত শান্তি প্রিয়। এখানে মানুষের মধ্যে নেই কোন দন্দ কোলহল। সবাই শান্তি প্রিয় হিন্দু মুসলমানদের ভিতর কোন হিংসা মনোভাব দেখা যায় না। সবাই সাম্প্রাদায়ীক সম্প্রীতির ভিতর দিয়েই সহ অবস্থান করছে। সবাই ঐক্যবদ্ধ ভাবে একে অপরের সাহায্য সহযোগীতায় হাত বাড়িয়ে দেয় পারস্পরিক সহযোগীতা, সমঝোতাসহ মর্মিতা এবং ভ্রাতৃত্ব বোধ খুবই বেশী। ঝাউডাঙ্গা বাজারে বা এই ইউনিয়নে কোথাও কোন দূর্নীতি ঘুষ ইত্যাদির কোন ছোয়া নাই। স্থানীয় প্রশাসন এবং বর্তমান চেয়ারম্যান খুবই সচ্ছতার সাথে এবং জবাব দিহীতার মাধ্যমে সকল ধরণের কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছেন। সুতরাং আমরা স্পষ্ট ভাবে বলতে পারি সাতক্ষীরা জেলার ভিতর সদর উপজেলার ১১নং ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নটি একটি রোল মডেল এবং ঐতিহ্যবাহী ইউনিয়ন। কিন্তু কিছু কিছু সমস্যা এর পিছনে রয়ে গেছে যেমন বাজারের অব কাঠামোর কোন উন্নতি হচ্ছে না। আমরা যে কোন গ্রামে গেলে উন্নয়নের অনেক রুপ রেখা দেখতে পাই। এমনকী গ্রামের ভিতর ও ৪/৫ তলা বাড়ী দোকান পাঠ গোডাউন এবং স্যাটে লাইটের ব্যবহার ও দেখি। কিন্তু ঝাউডাঙ্গা বাজারটি ব্যবসা বাণিজ্যের দিক দিয়ে অতন্ত উন্নত হলে ও বাজারে তেমন কোন ভোত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। বাজারে কোন দোতলা তিনতলা চারতলা বা বহুতল বিশিষ্ট ভবন নির্মান করা যাচ্ছে না। আসলে কারণকি আমরা কেউ বলতে পারিনা। বহুতলা বিশিষ্ট ভবন করতে গেলেই নাকি নায়েব অফিস থেকে বাধা আসে। কেন বাধা আসবে? বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ। সুতরাং ঝাউডাঙ্গা বাজার থেকে প্রতি বছর যে পরিমাণ ব্যবসায়িক লেনদেন হয় তা অনেক বাজারে বা ইউনিয়নে তা সম্ভব নহে। তাই বিশেষ করে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের কাছে জোর দাবী রাখবো সরেজমিনে তদন্ত করে যাতে অর্থনৈতিক ও বানিজ্যিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাজারকে আরও সম্প্রসারিত করা যায় এবং বহুতল ভবন নির্মান করা যায় তার সার্বিক সহযোগীতার জন্য উক্ত বাজারে আরও একটি বড় সমস্যা। বর্ষাকাল আসলেই সেই সমস্যায় পড়তে হয় বাজারের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত বেতনা নদী যার কোন জোয়ার ভাটা নেই। নদীটি সংস্কারের বিশেষ প্রয়োজন এবং বেতনার গা ঘেষে একটি খাল যার নাম ভাংড়ার খাল নামে পরিচিত গোবিন্দকাটির গ্রামের ভিতর পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের পাশ দিয়ে কলারোয়া উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত। খালটি একেবারে বিলীন হবার উপক্রম বৃষ্টি নামলেই খালের দুইধার প্লাবিত হয় এবং আশেপাশের জনগণের বসবাস করা অনেক কষ্ট সাধ্য যায়। শুধু তাই নয় শতশত একর জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এই এলাকার মানুষ একটি মাত্র ফসল পায়। অতি বৃষ্টির কারণে খাল ধারের লোকজনদেরকে হাইওয়ে রাস্তার ধারে আশ্রয় নিতে হয় । সুতরাং খালটি খনন করা ছাড়া অন্য কোন উপায় আছে বলে আমি মনে করি না। তাই জেলা প্রশাসনসহ বর্তমান সময়ের সদরের এম.পি মহোদয় এবং জেলা পরিষদের সুযোগ্য চেয়ারম্যান এবং উপজেলা পরিষদের সুযোগ্য চেয়ারম্যানসহ সকল প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের কাছে আমাদের এই মুহুর্তের আকুল আবেদন যাতে খালটি পুনরায় খনন করে এলাকার মানুষ আবারো পূর্বের ন্যায় সোনার ফসল ফলাতে পারে এবং নির্ভিকভাবে বসবাস করতে পারে তার সার্বিক সাহযোগিতা করা। আমরা সকলেই স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলি এবং নিজেদের কে রক্ষা করি। ভাল থাকি সুস্থ থাকি।

লেখকঃ জহিরুল ইসলাম শাহিন
সহঃ অধ্যাপক (ইং)
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ

Print Friendly, PDF & Email
এই সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন