বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৪৬ পূর্বাহ্ন

মসজিদের ইমাম সাহেবরা মাস্ক পরিধানে মুসল্লীদের উদ্বুদ্ধ করতে পারেন

জহিরুল ইসলাম (শাহিন) / ২৪৮
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৬ জুলাই, ২০২১

বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ এবং মসজিদের দেশ ও বলা হয়। বাংলাদেশে মসজিদের সংখ্যা অনেক বেশী। বিভিন্ন মসজিদে নামাজে দেখা যায় ইমাম বা মুয়াজ্জীনরা মাক্স ব্যবহার করেন না। তারা মনে করেন করোনা ভাইরাস কিছুই না এটা নিছক গজব। এটা বিপর্যয়ের বা মহামারীর কোন কারণ না। সুতরাং ভাইরাসটি দ্বারা যিনি আক্রান্ত হবেন তার বাঁচা মরা একমাত্র আল্লাহর হাতে নির্ভর করবে। এক্ষেত্রে কারোর কিছুই করার নেই। করোনা মহামারী ভাইরাস না গজব এই মুহুর্তে এটা নিয়ে বিতর্ক করার কোন প্রয়োজন নেই। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অবস্থা খুবই খারাপ। ভাইরাসটি এখন শুধু শহরে সীমাবদ্ধ নহে সমস্ত গ্রামে গঞ্জে হাটে বাজারে বিস্তার লাভ করেছে। গ্রাম গঞ্জের মানুষ ও খুবই আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। এখন করোনার হাত থেকে বা এই ভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া খুবই প্রয়োজন। একজন ইমাম বা মুয়াজ্জীন জনগনকে কি বললেন এইটা বিবেচ্য বিষয় নয়। এর ভয়াবহ থাবা থেকে পরিত্রান পাবার জন্য আমাদের প্রত্যেকটি সমজিদে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করতে হবে এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদেরকে নিজ নিজ উপাসনালয়ে প্রার্থনা করা উচিত এবং নিজেদের পরিবারের সবাইকে এবং অন্যদেরকেও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেওয়া উচিত। বিনা মাস্কে বাজারে ঘোরা ফেরা না করা ইত্যাদি বিষয়ে জনগনের ভিতর সচেতনতা বোধ তৈরি করা প্রত্যেক মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিনের এ মুহুর্তে দায়িত্ব বা কর্তব্য। মসজিদের একজন বিশিষ্ঠ আলেম বা হাফেজ যিনি ইমাম, সকল মুসল্লীর দায়িত্ব কাধে নিয়ে নামাজ পড়ান তিনি যদি বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেন যেন সকল মুসল্লি মাস্ক পরিধান করে মসজিদে আসবেন, মাস্ক ছাড়া এ মুহুর্তে মসজিদে আসা যাবে না, আপনারা সবাই মাস্ক পরিধান করবেন। আর যারা শারীরিক ভাবে একটু অসুস্থ্য অর্থাৎ করোনা ভাইরাসের কিছু আলামত বা নিদর্শন দেখা দেয় অর্থাৎ জ্বর, সর্দি, কাশি বা শরীর ব্যাথা খাবারে রুচি নাই এ ধরনের মানুষকে বিপর্যয়ের মুখে মসজিদে বা বাজারে আসার প্রয়োজন নেই। আমি মনে করি তারা অবশ্যই ইমাম সাহেবের এই সচেতন মূলক কথা সবাই শ্রদ্ধার সাথে গ্রহন করবেন। এ কথা নির্দিধায় বলা যায়। পৃথিবীতে পূর্বেও অনেক মহামারী ও বিপদজনক ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটেছে। হাজার হাজার লোক আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা ও গিয়েছে। ভারতে, চীনে, দক্ষিণ আফ্রিকায় এবং যুক্তরাষ্ট্রেও বিভিন্ন ভাইরাসের প্রাদূর্ভাব বেশী ঘটেছে। সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষেধক মূলক টিকা বা ঔষধও তৈরি হয়েছে। সেই সমস্ত ভাইরাস পৃথিবীতে এখনও আছে কিন্তু মানুষ আতংকিত নয়। বাংলাদেশেও অনেক ধরনের ভাইরাস মহামরী আকারে প্রবেশ করেছে। এক সময় বসন্ত রোগ যার নাম চড়ী, এই রোগে কেহ আক্রান্ত হলে, হয় মারা যেত নতুবা একটা অঙ্গ বিকল হয়ে যেত বা অন্ধ হয়ে যেত। এক এক অঞ্চল ব্যাপী ব্যপক প্রসার ঘটতো মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়তো এবং আক্রান্ত ব্যাক্তির ধারে কাছে কেহ যাইতো না। এখন কিন্তু ভাইরাসটি স্বাভাবিক। ঠিক তেমনি কুষ্টো রোগ বা যক্ষ্মা রোগ নাম শুনলে ভয়ে সে এলাকায় মানুষ যাইতো না। প্রবাদে আছে “যার হয়েছে যক্ষ্মা তার নাই রক্ষা”। এখন কিন্তু এইটা স্বাভাবিক একটি রোগ। কেহ ভয় পায় না। ম্যালেরিয়া, কলেরা, ডায়রিয়া, টাইফয়েড ইত্যাদি যদি হতো ঐ একই অবস্থা, মানুষ ভয় পেত, কষ্ট্ পেত। তার কাছে কেহ যাইতো না। ইত্যাদি ভাইরাস যুগে যুগে কালে কালে আমাদের দেশে ছিল। আবার উক্ত ভাইরাস থেকে সহজে পরিত্রান ও পাওয়া যাইতো। এখন সবগুলির ঔষধ বা টীকা আবিষ্কার হয়েছে। কিন্তু করোনা ভাইরাস টি এমন একটি ভাইরাস যাহা বার বার তার চতিত্রের পরিবর্তন ঘটছে এবং বিভিন্ন সময় আরও শক্তিশালী ভেরিয়েন্টে রুপান্তরিত হচ্ছে। সুতরাং মানুষের শরীরে এক ধরনের মৃত্যু ভয় কাজ করছে। তাই আমি বিশেষ করে ইমাম সাহেবদের কাছে, মুয়াজ্জীন সাহেবদের কাছে, মুফতি, মাওলানা বা শাইখদের কাছে আরজি রাখবো আপনারা যদি সকলকেই মাস্ক বাধ্যতা মূলক ব্যবহার করতে বলেন, জনগন পরিধান করবেন এটা আমি বিশ্বাস করি। গজব দিবে আল্লাহ, জন্ম দিবে আল্লাহ, মৃত্যু দিবে আল্লাহ আবার আমাদেরকে সুরক্ষা করবেন ও আল্লাহ। সুতরাং এই ভাইরাস এর হাত থেকে বাচার একটাই উপায় সবাইকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলা এবং নিজেকে সুরক্ষা করা। দেখবেন হয়তো বেশী দিন লাগবে না করোনা ভাইরাস দ্রুত বিদায় নিবে এবং এর মধ্যেই সারা বিশ্বে ভাইরাসের টীকা বা ঔষধ আবিষ্কার হয়ে যাবে। বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়াটাই হচ্চে প্রধান কাজ। আমরা জানি বাংলাদেশ গরীব দেশ। ঘন জনবসতির দেশ। একবেলা কাজ না করলে অন্য বেলা খাওয়া জোটে না। পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য যাহা যাহা করার দরকার কঠিন অবস্থার ভিতর দিয়ে সেটা আমাাদের করা উচিত। মনে রাখা উচিত সামনে কয়েকদিন পর ঈদুল আযহা যেখনে হাজার হাজার পশু কোরবানি করা হবে। এবং চারদিকের পরিবেশ দূষিত হবে। মহামারি করোনা ভাইরাস আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। এমুহুর্তে ল্যাম্বডা নামক অত্যন্ত শক্তিশালী আর একটি ভ্যারিয়েন্ট ধরা পড়েছে। বাংলাদেশে যে প্রবেশ করবে না একথা বলা যায় না। সুতরাং সরকার বারবার ঘোষনা দিয়েছেন, বিনা কারনে বাহিরে যাবেন না। আমরা দেখি মাস্ক বিহীন হাজার হাজার লোক কোন কারন ছাড়াই চায়ের দোকানে, বাজারে রাত দশটা পর্যন্ত আড্ডা দিচ্ছে। ইজিবাইকে বা মহেন্দ্রতে অধিক প্যাসেঞ্জার যাতায়াত করছে। কেহ কারোর তোয়াক্কা করছে না। লকডাউন আবার কি? কেহ মানছে না। সুতরাং উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করার জন্য সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে, পুলিশ ও বিজিবিকে আরও কঠোর হস্তে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। প্রয়োজনে মারমুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। কারন দিনের পর দিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বহু গুনে বেড়ে যাচ্ছে। এখন গ্রামের মানুষও ৫০ ভাগ আক্রান্ত হচ্ছে। সুতরাং এমুহুর্তে সকলেই এগিয়ে না আসলে আমাদের মত গরীব দেশে ভবিষ্যতে অনেকের অনাহারে অনাদরে থাকতে হবে। এক কথায় মহামারী করোনার ভয়াবহ থাবা থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য বা জনগনের সুরক্ষার জন্য প্রশাসনের যা যা করার দরকার এ মুহুর্তে করতে হবে। সন্ধ্যা হলেই গ্রামে গ্রামে চায়ের দোকান গুলিতে ও উপচে পড়া ভিড়। দেখা গেছে যে লোকটা করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে, হাজার হাজার টাকা হাসপাতালে খরচ হয়েছে তার ও মুখে মাস্ক নেই বা অনেক গুলি লোকের ভিতর সেও ভিড় জমিয়েছে। সুতরাং সরকারকে অনুরোধ করবো, এ মুহুর্তে ঢিলে ঢালা লকডাউনে বা শাট ডাউনে কিছুই হবে না। যদি না পুলিশ বাহিনী কঠোর অবস্থানে না যায়। যে কোন মূল্যে কঠোর অবস্থানে যাওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। প্রয়োজনে জেল, জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কারন দেশটা গরীব এবং অধিক জনসংখ্যার। এই ভাইরাসের বিস্তার লাভ যদি অনেকদিন ধরে চলতে থাকে তাহলে এদেশের বহু জনগনকে না খেয়ে থাকতে হবে। একথা মনে রাখতে হবে। আমরা এ ক্ষেত্রে প্রজাতন্ত্র গনচীনের কথা বলতে পারি। চীনের সরকার এতটাই কঠোর যে, করোনায় আক্রান্ত হলেই তার রেহাই নাই। বাবা বা মা মারা গেলে লাশটা সন্তানকে দেখতে দেবার সুযোগ নেই। ঘরের বাইরে গেলেই শাস্তির ব্যবস্থা। এত পরিমান লোক চীনে মারা গেছে যে শিল্প কারখানায় শ্রমিকের অভাবে তাদের শিল্পে অনেকটা ধস নেমে গেছে এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। গনচীন থেকে ও এই মুহুর্তে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ফ্রান্স, ইটালী, স্পেন, অস্ট্রিয়া, জার্মানী, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসন কঠোর ছিলো বিধায় এবং ঐ সমস্ত দেশ গুলির জনগন যথেষ্ট সচেতন তাই তারা করোনা ভাইরাসের হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছে এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের এমুহুর্তে আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের নীচে নেমে এসেছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ও শতকের নীচে নেমে এসছে। তারা কিছুটা দুঃশ্চিন্তা মুক্ত। পরিশেষে আমি বলতে চাই লকডাউনের ধরন পরিবর্তন করতে হবে এবং প্রশাসনকে আরও তৎপর হতে হবে। প্রয়োজনে কারফিউ বা ১৪৪ ধারার মত আইন প্রনয়ন করতে হবে। সবাইকে অনুরোধ করছি আর সময় বিলম্ব না করে নিজ নিজ দায়িত্ব নিয়ে আমরা ঘরে থাকার চেষ্টা করি। একটু ধৈর্য্য ধরি এবং নিজেদেরকে বাচিয়ে রাখার চেষ্টা করি। ইমাম সাহেবদের কাছে আবারও অনুরোধ দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে এবং বিশেষ করে জুম্মার সময় মসজিদে যদি মুসুল্লীদের বলেন “মাস্ক ছাড়া মসজিদে প্রবেশ করা যাবে না”। মনে হয় মসজিদের সব মুসুল্লী বাধ্যতামূলক মাস্ক পরিধান করবেন এবং সবাইকে পরিধানের জন্য ও উদ্বুদ্ধ করবেন। এটুকু মানুষ আপনাদের কাছে আশা করতে পারে।


লেখকঃ সহকারি অধ্যাপক (ইংরেজি)
বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ
কলারোয়া, সাতক্ষীরা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ