রবিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২২, ০৩:৫৯ পূর্বাহ্ন

নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হবে

শ্যামল শীল / ১৩৭
প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৩১ আগস্ট, ২০২১

বাংলাদেশের নিত্যদিনের পত্রিকা খুললেই যে খবর ছাড়া পত্রিকা দেখা যায় না তাহলো নারী নির্যাতন। আর এই নির্যাতনের মূল কারণ হিসেবে যৌতুক হলেও এখন আরো অনেক কারণ রয়েছে যার জন্য নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। যেখানে দেশের অর্ধেক নারী সেখানে এই নারী নির্যাতন বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের এমন কোন গ্রাম শহর নেই, যেখানে নারী নির্যাতন হচ্ছে না। উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত সব জায়গায় যেন বিষাক্ত বিষ ফোঁড়ার মত জায়গা দখল করে আছে এই শব্দটি। প্রতিবছর আমাদের দেশে বিভিন্ন দিবসগুলো খুবই গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়। দিবসের স্লোগানে দলমত নির্বিশেষে সবাই একই সুরে অঙ্গীকার করে শান্তির পথে সুখের পথে নীতির পথে আর স্লোগানের পথে এগিয়ে যাবে সবাই সবার জায়গায়। কিন্তু একদিকে দিবসের স্লোগান আর অন্যদিকে হচ্ছে নারী নির্যাতন। এই বছর ৮ মার্চ যখন পুরো দেশ নারী দিবসের কর্মসূচি পালন করছে বিভিন্ন দলীয় ও প্রশাসনিক সংস্থার ব্যক্তিরা সভা সেমিনার করছে মিছিল করছে সেইদিনই দেশের অনেক জায়গায় নারীরা হচ্ছে নির্যাতিত। পরের দিন ৯ মার্চ পত্রিকার পাতায় একদিকে সভা সেমিনারের খবর পড়ছি আর নির্যাতিত নারীর আর্তচিৎকারের বাণী পড়তে পড়তে চোখ মুছছি। নারী নির্যাতন এমন একটি বিষয় নিয়ে লিখতে বসে বার বার কলম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে চাচ্ছি এমন কারো সাথে কথা বলতে যেন তার কাছে সাহস পাই আর লিখতে পারি কিন্তু ভাগ্য তা করতে দিচ্ছে না। তাই হয়ত লেখাটা এলোমেলোও হতে পারে। প্রথমদিকে যখন প্রায় দেড় বছর আগে কলম হাতে নিই আশপাশের অনেকে বলেছে হ্যাঁ লিখুন বর্তমান সমাজে নারীরা লেখার জগতে আসতে চেয়েও পারে না। একবার এগোয় তো আবার পিছায়। ভেবেছিলাম আশপাশের কয়েক নারীর দৈনিক কর্মসূচি নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরব কিন্তু সবার একটাই কথা আসল নাম ঠিকানা ব্যবহার করতে দিবে না। সে নারী ঢাকার হলে আমাকে খুলনার লিখতে হবে। কেন? বলতে বলছে ‘‘আপনার সামনে মুখ খুলব ঘরে গেলে পেদানী খেতে হবে। তা তো আপনি বা আপনার মিডিয়ার লোকরা দেখবে না জানবেও না। আপনার লেখার জন্য তো আর পেদানী খাওয়া সম্ভব নয়।’’ হ্যাঁ পাঠক আমরা এগিয়ে গিয়েছি অনেকদিন দিয়ে যেমন সাফল্য মাতৃত্বে, সম্মানে, আবিষ্কারের সৃষ্টিতে ঠিক তার সাথে এগিয়ে গিয়েছে আমাদের নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রগুলোও প্রায়ও পত্রিকায়? আগের চেয়ে নারী নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে সেই হিসেবে ২০০৫ সালের শুধু ‘মে’ মাসের কিছু নমুনা তুলে ধরলাম প্রকাশিত হয়েছে ২০০৫ সালের জুন মাসের ৩ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকে মে মাসের কিছু চিত্র ধর্ষণের ঘটনা- ৯০টি, গণধর্ষণের ঘটনা- ২৯ জন, ধর্ষণের পর হত্যা- ১৬ জন, নারী পাচার- ৩৯ জন, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার- ২৭ জন। যৌতুকের কারণে হত্যা- ১৮ জন, এসিডদগ্ধ হয়- ১৫ জন। অপহরণের ঘটনা- ৩১টি, বিভিন্ন কারণে শিশু হত্যা- ৮০ জন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার ১৪৩ জন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। এই হিসাবটি লিখতে লিখতে বারবার মনে হচ্ছে আর কতদিন বাংলার নারী নির্যাতনের ইতিহাস লিখব। অথচ এই বাংলাকে স্বাধীন করার জন্য নারীরা হয়েছিল নির্যাতিত, আজও সেইসব বাঙ্গালী নারীরা তাদের নামের সামনে বীর শব্দটি না লিখে বীরঙ্গনা লিখতে হচ্ছে। এই বছর ২০১০ সালের প্রথম থেকে শেষ অবধি নারী নির্যাতনের হিসাব করলে হয়ত কলমের কালি শেষ হবে সাদা পৃষ্ঠাগুলো কালীতে ভরাট হবে তবুও নারীর ঘটনা যেন শেষ হবে না। পুরো দেশ বাদে শুধু রাজধানীতে ঘটেছে এমনকিছু ঘটনা আর নারী নির্যাতন প্রতিটির সাথেই রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ক্ষিপ্ততা, আর এই ক্ষিপ্ততাকে মেনে নিতে না পেরে নারীরা নিজের জীবন শেষ করেছে। আমরা সবাই বলছি মৃত্যুটা কোন সমস্যার সমাধান হতে পারে না। কিছুদিন আগে দৈনিক এক পত্রিকায় পড়েছি আত্মহত্যা নয় স্বাবলম্বী হও এমন শিরোনামের লেখা যেখানে অনেক নারীর স্বাবলম্বী হবার ঘটনাও পড়েছি। ওনারা সবাই স্বামীর সংসার ছেড়ে এসে সন্তানকে নিয়ে যুদ্ধ করেছে এবং স্বাবলম্বী হয়েছে। ঠিক এইখানে আমার একটা প্রশ্ন যে নারী স্বামী ছেড়ে এসে স্বাবলম্বী হয়েছে তবে কেন সে স্বামীর ঘরে থাকা অবস্থায় হতে পারেনি। সে কি চায়নি হতে। না পাঠক সে নারীও চেয়েছে কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ঐসব নারীকে স্বাবলম্বী হতে দেয়নি। পুরুষতান্ত্রিকতা, শিক্ষার অভাব, মূল্যবোধের অভাব পারিবারিক ঐতিহ্য, সচেতনতার অভাব, দারিদ্র্য যৌতুকলি≈v, বহুবিবাহ, জনসংখ্যার আধিক্য, সুস্থ বিনোদনের অভাব, সামাজিক অস্থিরতা, নিরাপত্তার অভাব, নারীর অবাধ চলাফেরা এইগুলোকে নারী নির্যাতনের কারণ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বর্তমানে আইন থাকা অবস্থায়ও আইনের সঠিক ব্যবহার প্রয়োগের অভাবে নির্যাতনের হার বেড়েই চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুদিনের মাঝে ছাত্রী নির্যাতনের ১২টি ঘটনা জনগণের সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১টির সঠিক বিচার হয় আর বাকি ১১টি ঘটনাই হারিয়ে যায় আইনের ফাঁক দিয়ে ও প্রশাসনের সহযোগিতায়। ১৯৮৩ সালে নারী নির্যাতন আইনে যৌতুকের জন্য হত্যার ঘটনা মৃত্যুদন্ড এবং ধর্ষণের ঘটনায় সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সশ্রম কারাদন্ডের বিধান রাখা হলেও বর্তমানে এইসব অপরাধ করে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে ঘুরে রাজপথে আর প্রশাসন বলছে প্রমাণের অভাবে তারা কিছুই করতে পারছে না। শারীরিকভাবে নির্যাতনের চিত্রগুলো মিডিয়ায় আসলেও মানসিক নির্যাতনের কোন খবর কেউই জানে না, অথচ প্রতিটা ক্ষেত্রে নারীর মানসিক নির্যাতনের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। আর এখনও আমাদের পরিবারগুলো পুরনো ধ্যান-ধারণায় চলতে গিয়ে বিয়ের পর মেয়েদের পরের বাড়ির নির্যাতনের খবরগুলোতে ধামাচাপা দিতে চায়। নারী বাধা পাচ্ছে প্রতিটি ক্ষেত্রে, তারপরও বর্তমানে নারীরা তাদের কর্ম দক্ষতায় এগিয়ে যাচ্ছে সাফল্যের দিকে। নারীরা তাদের পথ চলায় বাধা না পেলে আরো সাফল্য বহন করতে পারবে। তবে সবার আগে আমাদের সমাজব্যবস্থায় আনতে হবে পরিবর্তন, নারীদের শিক্ষার হারও বাড়াতে হবে। শহরের সাথে গ্রামে নারী শিক্ষার প্রসারতা বাড়াতে হবে। আমাদের দেশের সব সরকারই নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকলেও নারীর নিরাপত্তার অভাবে আর নির্যাতনের হার বাড়তে থাকায় নারীরা ঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারছে না।

লেখকঃ শ্যামল শীল, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।


এই শ্রেণীর আরো সংবাদ