ইস্ট বেঙ্গল বিক্রির ছক

ইস্ট বেঙ্গল বিক্রির ছক

কলকাতা: ক্লাব বাঁচানো, আর স্রেফ বেচে দেওয়ার মধ্যে ফারাকটা বেমালুম ভুলে গিয়েছেন ইস্ট বেঙ্গলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা। কথা ছিল, আইএসএল-এ খেলবে লাল-হলুদ। তার জন্য দরকার ইনভেস্টর। সেটাও হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে। কিন্তু পরিস্থিতি যা, তাতে চুক্তিপত্রে সই হলে ইস্ট বেঙ্গলের সেই ঐতিহ্য, সমর্থকদের ভালোবাসার জগৎটাই ধূসর হয়ে যাবে। চুক্তিপত্রের জালে ফেঁসে ঘটিবাটি সুদ্ধ বিক্রি হয়ে যাবে শতাব্দীপ্রাচীন ইস্ট বেঙ্গল। আর সমর্থকরা? তাঁদের কার্যত ঝ্যাঁটা মেরে দূর করে দেওয়া হবে ক্লাব থেকে। অস্তিত্বরক্ষার নামে যে লাল-হলুদ আবেগকেই নিলামে তোলা হচ্ছে! যা ছিল যুগ-যুগের সম্বল… আজ ভক্তদের সেই প্যাশনটাই রাতারাতি মূল্যহীন প্রণব দাশগুপ্ত, কল্যাণ মজুমদার, দেবব্রত সরকারদের কাছে। তাঁরা কি জানেন না, শ্রী সিমেন্ট লিমিটেডের পাঠানো চুক্তিপত্রে সই করলেই বিপদ?
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ইস্ট বেঙ্গলের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়ায় শ্রী সিমেন্ট কর্তৃপক্ষ। গত ১ সেপ্টেম্বর নবান্নে মউ এবং টার্মশিট সই হয়। বেচুবাবুর মতো ‘অটোগ্রাফ’ দেন ইস্ট বেঙ্গলের সচিব মনোনীত প্রতিনিধি সৈকত গঙ্গোপাধ্যায়। এখন বাকি শুধু কোলাবরেশন এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর। আর তখনই হরিমোহন বাঙ্গুরদের হাতে অসহায় আত্মসমর্পণের পালা শেষ হবে সাবেক কর্তাদের।
কী আছে এই চুক্তিপত্রে? ‘বর্তমান’-এর হাতে এসেছে দু’পক্ষের স্বাক্ষরিত সেই চুক্তিপত্র। টাকা ঢালার বিনিময়ে ইস্ট বেঙ্গলের সবকিছুই অক্টোপাসের মতো গ্রাস করতে চলেছে শ্রী সিমেন্ট। মন্দিরসম ক্লাবে প্রবেশের জন্য এরপর অনুমতি নিতে হবে সদস্যদের। আর সমর্থকরা? তাঁদের ঠাঁই সেখানে নেই। অনুশীলন দেখার অধিকারটুকুও হারাবেন তাঁরা। সদস্য কার্ড নবীকরণ করতে হবে এরিয়ান ক্লাবের পাশে প্রস্তাবিত কাউন্টার থেকে। আইএসএলে প্রিয় দলের ম্যাচে সব সদস্যের সুলভে টিকিট পাওয়ার কোনও গ্যারান্টি নেই। নতুন বোর্ডে থাকবেন শ্রী সিমেন্টের আটজন। বাকি দু’জন ইস্ট বেঙ্গলের। বোঝাই যাচ্ছে, সাবেক কর্তারা পুতুলের ভূমিকায় অভিনয় করবেন। কোলাবরেশন এগ্রিমেন্টে সই হলেই আগামী দিনে ক্লাবের কোনও বিভাগীয় সচিব তাঁবুতে বসতে পারবেন কি না, তা নিয়ে একরাশ ধোঁয়াশা রয়েছে। ইস্ট বেঙ্গলের মাঠ, গ্যালারি, ড্রেসিং-রুম, ব্রডকাস্ট অফিস, ম্যাচ অফিসিয়ালস রুম, পার্কিং, অ্যাক্টিভেশন স্টল, স্টোর, অফিস, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ এরিয়া, এলইডি স্ক্রিন—সবই থাকবে শ্রী সিমেন্টের মালিকানাধীনে। এছাড়া দু’টি টিম বাস, রাজডাঙায় অবস্থিত লাল-হলুদ অ্যাকাডেমির বাড়িরও মালিক হবে হরিমোহন বাঙ্গুরের প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থেকে বিচ্যুত হবে গর্বের ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব।
এখানেই শেষ নয়। সাবেক কর্তাদের কাছে পাঠানো কোলাবরেশন এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী, চুক্তি ছেড়ে বেরিয়ে আসার পথ শুধুমাত্র খোলা থাকবে শ্রী সিমেন্টের কাছে। চুক্তির এক বছরের মধ্যে তারা যদি সম্পর্ক ছিন্ন করে, সেক্ষেত্রে যাবতীয় ট্রেডমার্ক ব্যবহারের জন্য ২০ কোটি টাকা দিতে বাধ্য ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব। দ্বিতীয় বছরে এই অঙ্ক ৩০ কোটি। তারপর প্রতি বছর ১০ শতাংশ করে বাড়বে এর পরিমাণ। 
টার্মশিটের পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদে সাফ বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের কোম্পানি অ্যাক্ট অনুসারে সংযুক্তিকরণের পর তৈরি হবে নতুন এনটিটি। ইস্ট বেঙ্গলের যাবতীয় ট্রেডমার্কের (জ্বলন্ত মশাল, লাল-হলুদ রং ইত্যাদি) স্বত্ব ‘গিফ্ট ডিড’ হিসেবে পাবে এসসি ইস্ট বেঙ্গল। 
শ্রী সিমেন্টের কর্ণধার হরিমোহন বাঙ্গুর জানিয়েছেন, ‘টার্মশিটের ভিত্তিতেই আমরা কোলাবরেশন এগ্রিমেন্ট করতে চাইছি। এতে ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবেরই লাভ।’ লাল-হলুদের শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকারের বক্তব্য, ‘সদস্য-সমর্থকরাই ক্লাবের প্রাণ। ওঁদের কথা মাথায় আছে। আশা করি, চূ‌ড়ান্ত চুক্তি সই হওয়ার আগে উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে যাবতীয় সমস্যা মিটিয়ে নেবে।’ প্রশ্ন উঠছে, সমর্থকদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কি এভাবে ক্লাবের সর্বনাশ ডেকে আনতে পারেন? আগামী প্রজন্মের কাছে লাল-হলুদ ঐতিহ্য অটুট রাখার দায়িত্ব দেবব্রত সরকাররা কখনওই অস্বীকার করতে পারেন না। কিন্তু নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষমতা যাঁদের নেই, তাঁদের কাছে এমন আশা করাই মূর্খামি।

Print Friendly, PDF & Email
এই সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন